কালের খেয়া

কালের খেয়া


আঙ্গিক বৈচিত্র্যে সমাজ-বাস্তবতা

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৯      

নুরুল আম্বিয়া চৌধুরী

আঙ্গিক বৈচিত্র্যে সমাজ-বাস্তবতা

'লিলিবয়' [অয়েল অন ক্যানভাস] -শিল্পী ::শওকত শাওন

কাঙ্ক্ষিত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ন বিভাগের 'বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ২০১৯'। একঝাঁক তরুণ শিল্পীর রং-তুলির আঁচড়ে উঠে এসেছে সমাজ-বাস্তবতার নানা আঙ্গিক। শিল্প নিয়ে আগ্রহ যেমন দিন দিন বেড়ে চলেছে, তেমনি শিল্পীদেরও দর্শক মননে নিজের স্থান পাকা করে নেওয়ার প্রবণতা এই সুরচিত প্রদর্শনীতেও প্রবলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ছয় দিনব্যাপী প্রদর্শনীটি দর্শকের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

প্রদর্শনী দেখে বোঝা গেল, বাংলাদেশে বর্তমানে শিল্পচর্চার দুটি দিক খুব পরিস্কার। প্রথমত, একদল শিল্পী নান্দনিকতা চর্চা করতে বেশ পছন্দ করেন। তারা চিত্রে ফুল, লতাপাতা ও দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য এঁকে অর্জিত প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা প্রকাশ করেন। ভাবনার জগতে যাদের শুধুই সুন্দর খেলা করে, কিন্তু বাস্তবতা থেকে তা দূরে। অন্য শিল্পীদল যে সুন্দরের চর্চা করে না, তা বলা সমালোচকের জন্য আত্মঘাতী। সুন্দর হতে পারে বীভৎস, নির্জীব, নিষ্প্রাণ ও পীড়াদায়ক। তাদের কাছে সুন্দরের ব্যাখ্যা অন্যরকম। তারা সচেতন, জাগ্রত; যাদের তুলিতে রং এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তারা নান্দনিকতাকে নিরূপণ করে নতুনতর মাত্রায়। সেটি যে শুধুই প্রশান্তি দেয় তা নয়, সেটি ভাবায়। একজন সাধারণ দর্শকও এ শিল্প প্রদর্শনী দেখে কথাগুলো উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে মনে হয়।

প্রদর্শনীর চিত্রকর্মে বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পেয়েছে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে চলিত নানা দিক। যেমন, সমাজের নানা অসংগতি, অনাচার-অবিচার, শ্রেণিবৈষম্য, প্রজাতন্ত্রের নীতিনির্ধারকদের ধৃষ্টতার নিখুঁত উদাহরণ, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান, আর প্রতিফলিত হয়েছে ভঙ্গুর সমাজ কাঠামোর অন্তর্নিহিত স্বরূপ বিশ্নেষণ। নান্দনিকতার চর্চাও রয়েছে সেটিতে। শিল্পীদের প্রাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, বাস্তবতা থেকে ধার করা অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির দেয় অমূল্য সৃজনশীলতা ও সৃষ্টির নিত্যসূত্র- 'ধ্বংসের মাধ্যমে নূতনের আবির্ভাব' মেনে কৃত অলঙ্কারপূর্ণ এই শিল্প প্রদর্শনীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম নিয়ে পরবর্তী সমালোচনা। গ্যালারির প্রথম কক্ষে স্থান পেয়েছে নিরীক্ষামূলক ও ধারণানির্ভর চিত্রকর্ম। দরজা ভেঙে ঢুকলেই বর্তমান সময়ের আলোচিত সব ধারণানির্ভর শিল্প। শুরুতেই শিল্পী জয়ন্ত ম লের ক্যানভাসের ওপর অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে করা 'ইনার পাওয়ার অব উইম্যান ইন দিস টাইম' শীর্ষক কাজটি চোখে পড়ে। বর্তমান সমাজে নারীর অবস্থান তুলে ধরতে শিল্পী তার চিত্রকর্মে সম্প্রতি ফেনীর অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে উপস্থাপন করেছেন। নুসরাতকে তুলনা করেছেন হিন্দুধর্মের দেবী দুর্গার সঙ্গে, যে মহিষাসুরমর্দিনী। তবে, এখানে দুর্গার সরব উপস্থিতি নেই, আছে বর্বরোচিত হত্যার শিকার নুসরাত, যাকে একদল পিশাচ আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে। ধূসর কালো চিত্রপটের ওপর নীল-সাদা স্টু্কলড্রেস পরিহিত মৃত নুসরাত। চিত্রে সাপ, হায়েনা, হুজুরের পা ইত্যাদি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর বিপজ্জনক অবস্থানকে প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে।

বর্তমান সমাজে 'পরিবেশ দূষণ' নিয়ে অনেক উদ্বেগ কাজ করছে। আমরা যেখানে সেখানে প্লাস্টিক ফেলে নিজেদের ক্ষতি করছি। সেই ভাবনার ওপর ভর করেই পানি, বায়ু ও পরিবেশ দূষণের প্রতীকী উপস্থাপন ছিল শিল্পী অপ্সরা চৌধুরীর 'ডেসট্রাকটিভ মাইগ্রেশন' ও গৌরব নাগের 'প্লাস্টিক পল্যুশন' চিত্রকর্ম দুটিতে। অপ্সরা ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিকে আঁকলেন ভাসমান প্লাস্টিকের বোতল, যেটির স্থান পরিবর্তন সত্যই ক্ষতিকর। গৌরব নাগ মিশ্র মাধ্যমে করেন তার কাজটি। ক্যানভাসের ওপর জুড়ে দেন বাস্তবিক প্লাস্টিক। এই দুটি কাজ ছিল প্লাস্টিকের আগ্রাসনের প্রতি শৈল্পিক প্রতিরোধ।

অপ্সরা চৌধুরীর পাশেই আছে শিল্পী শওকত শাওনের চোখ ধাঁধানো 'লিলি বয়' শিরোনামের কাজটি। তেলরঙে করা কাজটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একজন বালক বৃষ্টিস্নাত অবস্থায় সদ্য তোলা পদ্ম কাঁধে নিয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে। এর চেয়ে নান্দনিক দৃশ্য আর কী হতে পারে! বৃষ্টির ফোঁটা তার শরীরকে শুধু যে ভিজিয়ে তুলছে তা কিন্তু নয়, বরং প্রশান্ত করছে তার মন ও আত্মাকে। ছবিটি দেখে এক ধরনের প্রশান্তি পেয়েছে দর্শক। শিল্পী পেছনের দৃশ্যপট নীরস রাখায় ছবিটিতে কিছুটা অঙ্গবিকৃতি ঘটেছে। পেছনে বর্ণিত নীরস পটের উপস্থাপন ক্যামেরার ব্লার ইমেজে দেখা যায়, যাকে শিল্পচর্চায় প্রযুক্তির আগ্রাসনও বলা যেতে পারে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধ নিয়ে চিত্র এঁকেছেন তরীকুল ইসলাম হীরক। 'ওয়ার অ্যান্ড ভিকটিমস-২' শীর্ষক কাজটিতে শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে উপস্থিত ছিল ঈগল ও ঘোড়া। চিত্রটিতে হীরক নিজেই নীরব দর্শক, যিনি ভিকটিম। বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে শক্তিশালী দু'পক্ষের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এই চিত্রের মূলভাব। মাধ্যমের বিভিন্নতা বেশ লক্ষণীয় সব কাজে। তেলরং, জলরং, অ্যাক্রিলিক ছাড়াও ট্যাপেসট্রিতে করা মিশ্রমাধ্যমের 'দ্য সানফ্লাওয়ার' কাজটি করেছেন শিল্পী জান্নাতুল ফেরদৌস নিশা।

গ্যালারির দ্বিতীয় রুমে অপেক্ষাকৃত একাডেমিক কাজ। কাজগুলো বিভাগের সম্মান পড়ুয়া উদীয়মান শিল্পীদের। মাধ্যমগুলোর মধ্যে রয়েছে পেন্সিল স্কেচ, স্টিল লাইফ, ওয়াটার কালার, অয়েল কালার, ল্যান্ডস্কেপ, ক্লোজ স্টাডি। ক্রস হ্যাচিং টেকনিকে আঁকা বিষয়বস্তুর পাশাপাশি গ্রামের দৃশ্য, নিসর্গ দৃশ্য, আইকনিক চিত্রও রয়েছে। তন্ময় শেখ এঁকেছেন চোখ জুড়ানো গ্রাম্য ল্যান্ডস্কেপ। জলরঙে আঁকা তামান্না তাসনীম সুপ্তির 'স্টাডি অব ম্যাকানিক্যাল পার্ট', সত্যই যেন যন্ত্রের অংশ। রঙের গাঢ়ত্ব, ঘনত্ব এবং হালকা থেকে ভারি হওয়ার ব্যাপারটা সঠিকভাবে ফুটে উঠেছে।