কালের খেয়া

কালের খেয়া

পুতুল নাচের ইতিকথা

নির্যাস

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

পুতুল নাচের ইতিকথা

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় [১৯ মে, ১৯০৮-৩ ডিসেম্বর, ১৯৫৬]

পুতুল নাচের ইতিকথা বাংলা কথাসাহিত্যের প্রখ্যাত শিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মূহূর্তে বাংলা কথাসাহিত্যে যে ক'জন লেখকের হাতে সাহিত্য জগতে নতুন বৈপল্গবিক ধারা সূচিত হয়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তার রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি। যার প্রায় প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য মানিক রচনার স্বকীয়তায় ফুটে উঠেছে এই 'পুতুল নাচের ইতিকথা' উপন্যাসে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে মানুষের অবস্থার একটি তীক্ষষ্ট বিশ্নেষণ করেন। ১৯০৮ সালের ১৯ মে জন্মগ্রহণকারী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৫ সালে লেখালেখিতে প্রবেশ করেন। ১৯৩৫ সালে শুরু করে ১৯৩৬ এই লিখে ফেলেন 'পুতুল নাচের ইতিকথা'র মতো প্রভাবশালী এ উপন্যাসটি। মূলত 'পুতুল নাচের ইতিকথা' ও 'পদ্মা নদীর মাঝি' এই দুটি উপন্যাসই তাকে কিংবদন্তি কথাশিল্পীতে পরিণত করে। মানিক বাবু চেয়েছিলেন এ উপন্যাসের দ্বিতীয় খ লিখবেন। পরে তা আর হয়নি। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখ্যযোগ্য সংযোজন এই 'পুতুল নাচের ইতিকথা' উপন্যাসে ফ্রয়েডের 'লিভিডো' আর সমাজতন্ত্রের মন্ত্রে দীক্ষিত একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে গভীরভাবে পাওয়া যায়।

গ্রামীণ দৃশ্যপটে 'পুতুল নাচের ইতিকথা' ব্যক্তির ভণ্ডামি, জটিলতা ও দুর্বোধ্যতাকে উপস্থাপন করে। সমসাময়িক আখ্যান থেকে ভিন্ন এই উপন্যাসের প্রধান উপজীব্য হিসেবে পাওয়া যায় সমাজের কেন্দ্রীকরণ- প্রধানত সমাজে জীবিত ব্যক্তি সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি করে, যারা তাদের দ্বৈধভাব এবং মনের অন্ধকার দ্বারা সমাজকে দূষিত করছে, তাদের চরিত্রকে উন্মোচিত করেছেন মানিক।

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র 'শশী'। সদ্য ডাক্তারি পাস করে গ্রামে আসে। সে গ্রামে আসে বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভিন্নতর সংস্কৃতি কিংবা সহজ ভাষায় উন্নত জীবনের সন্ধানে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সে আর প্রথাগত জীবনের বাইরে যেতে পারে না। গ্রামীণ জীবনের প্রতিবেশ-পরিবেশের বৈচিত্র্য আর বাস্তবতার ডালপালা এমনভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে যা ছিঁড়ে বের হওয়া শশীবাবুদের সামর্থ্যের বাইরে। মানিকবাবুর সার্থকতার সঙ্গে 'পুতুল নাচের ইতিকথা'র প্রকৃত সার্থকতাই মিশে গেছে জীবনঘনিষ্ঠ মানুষের চরিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ আখ্যান রচনায়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনবোধ, সমাজ চেতনা ও বিজ্ঞানমনস্কতার এক পরিপূর্ণ মিথস্ট্ক্রিয়া হচ্ছে এই উপন্যাসটি। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের স্পর্শকাতর রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে পুতুল নাচের ইতিকথা একটি একক ব্যক্তির গল্প নয়, বরং বিভিন্ন ব্যক্তির অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। সেই সঙ্গে আদিমতা, ভ ামি এবং মানব মনোবিজ্ঞান, অন্ধকার উপন্যাসের একটি চরিত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরিসীম লেখনীশক্তি আর বিশ্নেষণ ক্ষমতায় সব কিছু মিলিয়ে তাই এটি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং এখনও বহুল প্রশংসিত উপন্যাস।