মানব পাচারকারীদের টার্গেট রোহিঙ্গা শিবির
রোববার সাগপরপথে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় ২২ রোহিঙ্গাকে আটক করে ক্যাম্পে নিয়ে যায় বিজিবি -সমকাল
আবদুর রহমান, টেকনাফ
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ০৬:৫৪ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ০৮:০৭
সমুদ্রপথে মানব পাচারকারী চক্র এবার পাচারের জন্য কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরকে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তারা। এসব পাচারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গাদেরই একটি দালাল চক্র। বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য মিলেছে।
রোববার সাগপরপথে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় ২২ রোহিঙ্গাকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবির) সদস্যরা। তার মধ্যে ১১ শিশু, ১০ নারী ও এক পুরুষ রয়েছেন। তারা সবাই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। এরআগে গত শুক্র ও শনিবার উখিয়া-টেকনাফ উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচারের সময় ৭০ জন রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৮ জন নারী, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২০-এর মধ্যে। তাদের গভীর সমুদ্রে নোঙর করা জাহাজে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এ ঘটনায় চার দালালকেও আটক করা হয়েছে। তারা হলেন- টেকনাফের মোহাম্মদ মহিবুল্লাহ, মোহাম্মদ হুমায়ুন, মোহাম্মদ মামুন ও উখিয়ার আব্দুল কাদের। এ ছাড়া গত ছয় মাসে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় শতাধিক রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে র্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশ। তাদের মধ্যে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গাকে সমুদ্রে দুই-তিন দিন ঘুরিয়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর কথা বলে টেকনাফ সমুদ্রতীরে নামিয়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন র্যাব-৭ টেকনাফ ক্যাম্পের ইনচার্জ লে. মির্জা শাহেদ মাহতাব। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে র্যাবের ব্যাপক নজরদারি রয়েছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি রোহিঙ্গা মানব পাচারকারীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
পাচারের পুরনো রুট : ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় সহস্রাধিক বাংলাদেশি আটক হন। মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়া এই বাংলাদেশিদের অনেকেই ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় পথেই মারা যান। আবার সে সময় থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলে অসংখ্য গণকবর আবিস্কৃত হয়। মিয়ানমার, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সমুদ্রপথে পাচারের শিকার হয়ে বন্দিশিবিরে কিংবা যাত্রাপথে প্রাণ হারানো মানুষের এসব কবরের সন্ধান পাওয়ার খবরে সে সময় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্ত মানব পাচারের অন্যতম রুট।
টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র আবদুল্লাহ মনির বলেন, নতুন করে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মানব পাচারের চেষ্টার খবর দেশের জন্য অশনিসংকেত।
রোহিঙ্গাই জড়িত : ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী মুসলমান রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে নির্বিচারে গণহত্যা ও নির্যাতন চালানোর কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এ ছাড়া আগে থেকেই বাংলাদেশে চার লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে উখিয়া-টেকনাফে অশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১১ লাখের বেশি, যারা কর্মহীন ও অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ অবস্থান করছে উখিয়ায়। তাদের প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে মানব পাচারকারী চক্রগুলো আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে। সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচারে টার্গেট করা হচ্ছে এসব রোহিঙ্গাকে। এই পাচারের সঙ্গে যুক্ত আবার রোহিঙ্গাদেরই একটি অংশ। এরই মধ্যে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা দালাল। তাদের দেওয়া তথ্যে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরে মানব পাচারকারী চক্রের অনেক সদস্যের নাম বেরিয়ে আসে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- হাফেজ ছলিম, আতাত উদ্দিন, মোহাম্মদ আলম, আবদুর করিম, হাফেজ মোহাম্মদ আইয়ুব, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, মোহাম্মদ কবির, আমির হোসেন, মোহাম্মদ ফয়েজ, নূর হোসেন, মোহাম্মদ রশিদ, হাসিম উল্লাহ, মোহাম্মদ শাহ ও মোহাম্মদ হামিদ। তারা সবাই উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা।
উখিয়া থানার ওসি আবুল খায়ের বলেন, দালালরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা এবার রোহিঙ্গা শিবিরগুলোকে টার্গেট করেছে। এ কারণে রোহিঙ্গা শিবিরে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। যেসব রোহিঙ্গা দালাল রয়েছে, তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।