প্রেমের বিয়ের এমন পরিণতি!

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

মো. মাসুম মিয়া, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা

বিয়ের পর সেলফিতে সুমন ও তৃপ্তি

চার বছর প্রেমের পর গত ২৩ এপ্রিল পালিয়ে বিয়ে করেন সুমন ও তৃপ্তি। তবে বেপারী বংশের ছেলের সঙ্গে মণ্ডল বংশের মেয়ের এ সম্পর্ক মেনে নেয়নি তৃপ্তির পরিবার। তাদের বক্তব্য, 'নীচু' জাতের ছেলের সঙ্গে এ বিয়ে হতে পারে না। তাই সুমনকে না পেয়ে ওই দিন রাতেই তার বাবা, মা ও ভাইকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় তৃপ্তির পরিবারের লোকজন। সারারাত তাদের বেঁধে রেখে করা হয় মারধর। পরদিন সকালে তৃপ্তির বাবার করা অপহরণ মামলায় গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। 

২০ দিন পর সুমনের মা এবং তিন মাস পর বাবা ও ভাই জামিনে মুক্তি পান। এরই মধ্যে বিয়ে মেনে নেওয়ার কথা বলে সুমন ও তৃপ্তিকে কৌশলে ডেকে নেওয়া হয়। বসে সালিশ-বৈঠক। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, তৃপ্তি আর সুমনের সঙ্গে সংসার করবেন না এবং তার বাবা মামলা তুলে নেবেন। তবে তা আর হয়নি। এখন অপহরণের মামলার আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন সুমন। আর মামলার খরচ চালাতে গিয়ে এরই মধ্যে ভিটেবাড়ি বাদে সব জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে তার পরিবার। খেয়ে না-খেয়ে দিন কাটছে তাদের।

সিনেমার কাহিনীর মতো ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের বেলুয়া গ্রামে।

সুমনের পুরো নাম সুমন আহম্মেদ। বেলুয়া গ্রামের সবর বেপারীর ছেলে তিনি। টেলিকমিউনিকেশন বিষয়ে ডিপ্লোমা শেষ করে একটি গার্মেন্টের আইটি বিভাগের কর্মী তিনি। আর কলেজছাত্রী ফাতেমাতুজ জহুরা তৃপ্তি একই গ্রামের সুলতান আহম্মেদের মেয়ে।

সুমন বলেন, তৃপ্তির বড় ভাই শয়নের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকায় তাদের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। এক পর্যায়ে তৃপ্তি ও তার মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। চার বছর ধরে চলে সম্পর্ক। তৃপ্তি জানত, পারিবারিকভাবে এ বিয়ে তার বাবা মেনে নেবেন না। জন্মসনদ অনুযায়ী এ বছর এপ্রিলের ২৩ তারিখ তার বয়স ১৮ পূর্ণ হয়। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওই দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে গাজীপুর গিয়ে এক লাখ টাকা দেনমোহরে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেন তারা।

সুমন বলেন, তার ভাই একটা এনজিওতে চাকরি করতেন। তিন মাস জেলে থাকায় তার চাকরি চলে যায়। সুমন আর তৃপ্তি বাসা ভাড়া নিয়ে গাজীপুরেই থাকতেন। এর মধ্যে তৃপ্তির বাবা জানান, তাদের সম্পর্ক মেনে নেবেন এবং মামলার বিষয়ে সমাধান করবেন। 

তিনি বলেন, সেই খবর পেয়ে তৃপ্তিকে নিয়ে আমি আমার বোনের বাড়ি মধুপুরে যাই। সেখান থেকে তৃপ্তিকে তার বাবা ও স্বজনরা নিয়ে যান। পরদিন চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এক সালিশ হয়। মেয়ের বয়স হয়নি জানিয়ে তৃপ্তির বাবা আমার কাছে ওকে আর দেবেন না এবং মামলা তুলে নেবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কিছুদিন পর মামলা না তুলে উল্টো তৃপ্তিকে ভয় দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে আদালতে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

বিয়ের কাগজপত্র ও অডিও-ভিডিও ফাইল দেখিয়ে সুমন বলেন, এখন আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। অভাবের সংসারে মা, বাবা ও ভাই না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। মামলার খরচ জোগাতে যা জমি ছিল, ভিটেবাড়ি ছাড়া সব বিক্রি করা শেষ।

সুমনের মা জহুরা বেগম বলেন, মেয়ের বাবা মেম্বারকে দিয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাদের যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিন-চার লাখ টাকা দিলে মামলা তুলে নেবেন। এখন আমাদের বাড়ি বিক্রি ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

তবে তৃপ্তির বাবা সুলতান আহম্মেদ বলেন, তিনি তাদের কাছে কারও মাধ্যমে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করেননি। যেহেতু মামলা চলছে, আদালতেই বিষয়টির সমাধান হবে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান রওশন খান আইয়ুব বলেন, তার উপস্থিতিতে মেম্বারসহ গ্রামের লোকদের নিয়ে একটা সালিশি বৈঠক হয়। ওই সালিশের পর দুই পক্ষের কেউই আর যোগাযোগ করেনি। বিষয়টি কী অবস্থায় আছে, তা আমার জানা নেই। ইউপি সদস্য মির্জা গোলাম মওলা বলতে পারবেন।

তবে স্থানীয় ইউপি সদস্য মির্জা গোলাম মওলা দাবি করেন, বিষয়টি নিয়ে কোনো সালিশি বৈঠক হয়নি। মামলা হওয়ায় এটি এখন আদালতে চলে গেছে।