ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

মিরসরাইয়ে এমপিপুত্রে বিভক্ত আওয়ামী লীগ

মিরসরাইয়ে এমপিপুত্রে বিভক্ত আওয়ামী লীগ

সারোয়ার সুমন, মিরসরাই থেকে ফিরে

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ০১:৫৮ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ০১:৫৮

ভোটের মাঠে এবার জমাট লড়াই দেখার জন্য মুখিয়ে আছেন চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনের প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ভোটার। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, তাদের সামনে ততই স্পষ্ট হচ্ছে নানা সমীকরণ। আর এই সমীকরণের আগুনে ঘি ঢেলেছেন সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন নিজেই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে এ আসনে তিনি আর নির্বাচন না করে তাঁর ছেলে মাহবুবুর রহমান রুহেলকে প্রার্থী করাতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর এমন আগ্রহে ডালপালা মেলেছে নতুন সমীকরণ। কারণ মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা ‘রাজপুত্র’ হিসেবে রুহেলকে মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, এমপি পদে প্রার্থী হিসেবে বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো যোগ্যতা এখনও হয়নি রুহেলের। তাঁকে ঠেকাতে জোটও বাঁধছেন অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও।

ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদের এলাকাতে সর্বজন শ্রদ্ধেয় একটি ইমেজ রয়েছে। দলের জন্য তিনি প্রার্থী হিসেবেও হেভিওয়েট। তাঁর অবর্তমানে মিরসরাইয়ে প্রার্থী হতে আগ্রহী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন, কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য নিয়াজ মোর্শেদ এলিট এবং এসএসএফ ও এনএসআইর সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামছুল আলম চৌধুরী প্রকাশ শামস চৌধুরী। সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়াও ১৪ দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইবেন এ আসন থেকে।

এমপির হয়ে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন যারা

মোশাররফ হোসেন এলাকাতে সময় দিতে পারছেন কম। তাঁর অবর্তমানে উপজেলাতে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও হাইতকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী।

সরেজমিনে জানা গেছে, উপজেলার উত্তর অঞ্চলে স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন মোশাররফ অনুসারী করেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জসীম উদ্দিন, চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন, আওয়ামী লীগ নেতা কামরুল ইসলাম, উপজেলা যুবলীগের সদস্য সচিব ইব্রাহীম খলিল, বারইয়ারহাট পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম খোকন, জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম মাস্টার ও দুর্গাপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন রুবেল। দক্ষিণ অঞ্চলে স্থানীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন মিরসরাই পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীন হোসেন তপু, চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন মাস্টার, উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মাসুদ করিম রানা, উপজেলা যুবলীগ নেতা আশরাফুল কামাল মিঠু ও সাহেরখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম। রুহেলকে প্রতিষ্ঠিত করতে এলাকাতে কাজ করছেন তারা। তাদের কারণে মিরসরাই আওয়ামী লীগে বাড়ছে বিভক্তিও।

পোস্টার, ব্যানার ও বিলবোর্ডে ‘রাজপুত্র’

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মিরসরাই মহাসড়ক ও বাজারের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থানীয় নেতাকর্মীর নামে লাগানো পোস্টার ও বিলবোর্ডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ছবির পাশে বড় করে আছে মাহবুবুর রহমান রুহেলের ছবিও। দলীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে না থাকলেও দলীয় সভানেত্রীর ছবির পাশে কেন রুহেলের ছবি থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।

মিরসরাই পৌরসভার চায়ের দোকানদার মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এখানে রাজপুত্রের ছবি ছাড়া কেউ পোস্টার দিতে পারে না।’ সরকারি সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এমপির অনুপস্থিতিতে মিরসরাইয়ের সভা-সমাবেশেও অতিথি হন রুহেল। তাঁকে মূল্যায়ন না করলে এখানে রাজনীতি করা যাবে না।’

কথা বলে এর সত্যতাও মেলে। মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল আলোচনা সভা, ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রুহেল। অথচ একই অনুষ্ঠানে মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন। কিন্তু এসব সিনিয়র নেতাকে উপেক্ষা করে তিনি নিজেই বসেছেন প্রধান অতিথির আসনে। এমন কর্মকাণ্ডে তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান ও শিষ্টাচার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অন্যান্য মনোনয়নপ্রত্যাশী। তারা মনে করছেন, এমপিপুত্র বাবার প্রশ্রয়ে বারবার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হচ্ছেন। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর ও ২১ ফেব্রুয়ারির মতো সরকারি জাতীয় দিবসগুলোতে কুচকাওয়াজ শেষে সালাম গ্রহণ করতেও দেখা গেছে তাঁকে।

তবে মাহবুবুর রহমান রুহেল বলেন, ‘সভা-সমাবেশে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে আমাকে প্রধান অতিথি করতে কাউকে বাধ্য করিনি। সিনিয়ররা সর্বসম্মতভাবে সম্মান দিলে আমি সেটা রক্ষা করি।’

কোণঠাসা অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা

রুহেলকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অন্য নেতাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে মিরসরাইয়ে। এদেরই একজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন। এক সময় প্রতাপ থাকলেও মিরসরাইয়ের রাজনীতিতে এখন ‘একঘরে’ হয়ে আছেন তিনি।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘৫০ বছর ধরে রাজনীতিতে আছি। মিরসরাইয়ে আমার নেতাকর্মীও আছে। তারা প্রকাশ্যে আমার জন্য কিছু করতে পারছে না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে অনেকে। মিরসরাইকে কেউ পৈতৃক সম্পত্তি বানাতে পারবে না। বাবা না করলে ছেলে আসবে– এমন সমীকরণ মেনে নেবে না সাধারণ মানুষ। প্রধানমন্ত্রী সব জানেন। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি নিশ্চয় সব বিবেচনা করবেন।’

প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন যুবলীগ নেতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিটও। এই কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতার অনুসারীরা প্রচারণা চালাতে গিয়ে বেশ কয়েক দফা হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁর অনুসারীদের ওপর সর্বশেষ হামলা করা হয় মঘাদিয়া ইউনিয়নের মিয়াপাড়া এলাকায়। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনপন্থি স্থানীয় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন মাস্টারের নেতৃত্বে এ হামলা হয়। এ ঘটনায় দুই পক্ষের মধ্যে দলীয় নেতাকর্মীকে আসামি করে পাল্টাপাল্টি মামলা দায়েরের ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে হামলা করা হয়েছিল তাঁর বাড়িতেও।

নিয়াজ মোর্শেদ এলিট বলেন, ‘মিরসরাই উপজেলা কারও কাছে ইজারা দেননি প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানেন কার যোগ্যতা কতটুকু আছে। দলীয় কোনো পদে না থাকার পরও যে ব্যক্তি রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে প্রধান অতিথি হয়; তাঁকে মিরসরাইয়ের মানুষ কোনো দিন মেনে নেবে না। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে চূড়ান্ত।’

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী এসএসএফ ও এনএসআইর সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামছুল আলম চৌধুরী প্রকাশ শামস চৌধুরী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নৌকার মাঝি ঠিক করবেন। মিরসরাই আসনটি কারও পারিবারিক সম্পদ নয়। এখানে যোগ্য প্রার্থী আছেন অনেকে।’

মনোনয়ন প্রসঙ্গে আইটি বিশেষজ্ঞ মাহবুবুর রহমান রুহেল বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে যারা পিছিয়ে আছেন, তারাই আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। আমি মিরসরাইবাসীর সুখে-দুঃখে আছি দুই দশক ধরে। মনোনয়ন পেলে মিরসরাইকে মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলব।’

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমার বয়স হয়েছে। সাতবার এমপি হয়েছি। মন্ত্রীও হয়েছি। তারপরও নির্বাচন করার চেষ্টা করব। কোনো কারণে যদি বয়স সাড়া না দেয় ছেলেকে যোগ্য মনে করি। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি জানেন। তাঁর সিদ্ধান্তই আমার কাছে চূড়ান্ত।’

মিরসরাইয়ে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর হয়েছে। আরও হাজার কোটি টাকার কাজ হয়েছে আমার সময়। কিছু কাজ এখনও অসমাপ্ত আছে। এগুলো সমাপ্ত করতে যোগ্য মানুষ দরকার। ছেলে রুহেলের মধ্যে সেই যোগ্যতা আছে বলে মনে করে এলাকাবাসীও।’

উত্তেজনায় জল ঢেলে দিতে পারেন দিলীপ বড়ুয়া

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিরসরাইয়ের আসনটি ১৪ দলীয় জোট নাকি আওয়ামী লীগের কেউ পাবেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে এখনও। তবে গত ১৯ আগস্ট ১৪ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের (এমএল) সাধারণ সম্পাদক সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া নিজের প্রার্থিতা প্রসঙ্গে মিসরাইয়ে এসে বলেন, ‘এখান থেকে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে আমি মনোনয়ন চাইব। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দেবেন।’ তাঁর এমন বক্তব্যের পর নতুন সমীকরণ মাথাচাড়া দিচ্ছে মিরসরাইয়ে।

আরও পড়ুন

×