ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কান্না আর বিষণ্নতায় ঘেরা ‘বৃষ্টি’ ছাড়া প্রথম ঈদ

কান্না আর বিষণ্নতায় ঘেরা ‘বৃষ্টি’ ছাড়া প্রথম ঈদ
×

নিহত সাংবাদিক বৃষ্টি খাতুনের বাড়িতে ঈদের আমেজ নেই। ছবিতে তার মা ও প্রতিবেশী- সমকাল

মুনসী লিটন, খোকসা (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৪ | ২৩:০১ | আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৪ | ০৭:০২

বড় মেয়ে বৃষ্টি খাতুন ওরফে অভিশ্রুতিকে ছাড়া প্রথম ঈদের দিনটি মা বিউটি খাতুন নীরবে চোখের জল ফেলে কাটালেন। সমাজে সিন্নি পাঠানোর উদ্যোগও নেননি। ছোট দুই মেয়ে ঝর্ণা ও বর্ষাসহ পরিবারের কেউই নতুন কাপড় পরেননি। নিহত মেয়ের ব্যবহারের জিনিসপত্র ফেরত আনার পর বাড়িতে নতুন করে শোকের ছায়া নেমেছে। সদ্য সন্তানহারা সাবলুর আলম সবুজের এক বোন সামান্য কিছু ফিন্নি সেমাই রান্না করেছেন কিন্তু দুপুর পর্যন্ত পরিবারের কেউ তা ছুঁয়েও দেখেননি। 

খোকসার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের বনগ্রাম পশ্চিম পাড়ার নিহত সাংবাদিক বৃষ্টি খাতুনের বাড়িতে ঈদের আমেজ নেই। বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ১০টা, তখন গ্রামে সবে ঈদুল ফিতরের ঈদের জামাত শেষ হয়েছে। কিন্তু ঈদের আনন্দে যেন বিষাদের ছায়া ফেলেছে নিহত সাংবাদিক ও ইডেন কলেজের ছাত্রী বৃষ্টি খাতুনের গ্রামের বাড়ি জুড়ে। বাড়ির প্রবেশ পথের পাশের সিঁড়িতে বসে মেয়ের থাকার ঘরের দরজার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলেন বিউটি খাতুন। তার চোখে অশ্রুধারা। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল প্রতিবেশী এক শিশু। ঈদের দিন সকালে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান রুকুসহ অনেকেই শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে বৃষ্টির বাড়িতে আসেন। 

বৃষ্টির ব্যবহারের জিনিসপত্র নিয়ে গত মঙ্গলবার রাতে বাড়ি ফিরেছেন বাবা সবুজ শেখ। মেয়ের মোবাইল ফোন, এসএসসি ও এইচএসসি পাসের সার্টিফিকেট ছাড়া বাকি ব্যবহারের জিনিস পেয়েছেন। ঈদের দিন সকাল সাতটার আগে ঈদের নামাজ পরার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ফেরেননি। ফোনও রিসিভ করলেন না। পরে তার ভাই জোয়াদ আলী জানালেন, মেয়ের জন্য জাকের পার্টির পক্ষ থেকে কুষ্টিয়া জেলা সদরে একটি দোয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি সেখানে গেছেন। 

কয়েকবার জানতে চাওয়ার পর বিউটি খাতুন মৃদু স্বরে বললেন, ‘আমার জীবনে আর শখ-আহ্লাদ নেই। কোথায় সিন্নি! কোথায় কী?’ আবার শুরু করলেন নীরব কান্না।   

বড় আপা (বৃষ্টি) ছাড়া ঈদ ভালো যাচ্ছে না ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী কুলসুমের। বৃষ্টি তার চাচাত বোন। প্রতি বছর ঈদের দিন সকালে বৃষ্টি তার হাতে মেহেদী দিয়ে দিতো। সাজগোজ করাতো। অনেক গল্প বলত। সারাদিন কাছে কাছে রাখতো। এবার আর বড় আপা নেই। তাকে কেউ চুড়ি পড়িয়ে দেয়নি। সাজিয়ে দেয়নি। অনেক কষ্ট করে নিজেই  সেজেছে। 

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর গ্রীন রোডের অগ্নিকাণ্ড শুরুর কয়েক মিনিট পর প্রতিবেশীর ছেলে ও ঢাকার একটি কলেজের ছাত্র তামিম আহম্মেদ বৃষ্টিকে ঘটনাটি জানিয়ে মোবাইলে মেসেজ দিয়েছিলেন। কিন্তু আর ফিরতি মেসেজ আসেনি বৃষ্টির কাছ থেকে। পরদিন শুক্রবার (১ মার্চ) তিনি টেলিভিশনে খবর দেখে জানতে পারেন ওই অগ্নিকাণ্ডে নিজেই মারা গেছেন বৃষ্টি। এই শিক্ষার্থী জানান, বৃষ্টি তার বড়। বাড়ির সামনা-সামনি বাড়ি হওয়ায় তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। বৃষ্টি মাথায় সব সময় বড় হওয়ার স্বপ্ন কাজ করতো। 

বৃষ্টির চাচি সুইটি খাতুন জানান, ঈদের দিন রোজিনা খাতুন নামের এক ননদ এসে কিছু খাবার তৈরি করেছেন। কিন্তু এ বেলা পর্যন্ত কেউই খায়নি (বেলা ১২টা)। কলেজছাত্রী মেজো মেয়ে ঝর্ণা ঘরে বসে বৃষ্টির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ধরে কাঁদছে। ছোট মেয়ে বর্ষা বোনের জন্য কাঁদছে, কোরআন পড়ছে।    

বৃহস্পতিবার দুপুরে খোকসা উপজেলা সদরের মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে বৃষ্টির বাবা সাবলুল আলম সবুজ শেখের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। সবুজ জানান, তিনি খুব সকালে জাকের পার্টির দোয়ার মাহফিল ও ঈদের জামায়াতে শরিক হতে কুষ্টিয়া গিয়েছিলেন। প্রয়াত মেয়ের শিক্ষা সনদ ও মোবাইল ফোনটি এখনো হাতে পাননি। মঙ্গলবার রাতে মেয়ের পোশাকসহ ব্যবহারের জিনিসি বাড়ি এনেছেন। তবে যারা তার মেয়ের লাশ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান এই বাবা। 

পারিবারিক সূত্র জানায়, বৃষ্টি খাতুন বনগ্রাম পশ্চিমপাড়া উপানুষ্ঠানিক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৯ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ সমাপ্ত করেন। ২০১০ সালে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন বনগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে এসএসসি উত্তীর্ণ হন ২০১৫ সালে। একই বিভাগ নিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি গার্লস কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাসের পর ২০১৮ সালে ইডেন মহিলা কলেজে দর্শন বিভাগে ভর্তি হন। তবে দুটি সেমিস্টারে অংশ নেওয়ার পর অনিয়মিত হয়ে পড়েন। অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য রিপোর্টে ডটলাইভে অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামে শিক্ষানবিশ সংবাদকর্মী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। 

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছেড়ে দেন। নতুন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরুর কথা ছিল। ২৯ ফেব্রুয়ারি এক বন্ধুর সঙ্গে বৃষ্টি রাতের খাবার খেতে যান রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজের একটি রেস্তোরাঁয়। সেখানে ভয়াবহ আগুনে ৪৬ জন মারা যান। তাদের একজন বৃষ্টি। তার অভিশ্রুতি শাস্ত্রী নামের কারণে পরিচয় নিয়ে ধূমজাল সৃষ্টি হয়। পরে ডিএনএ টেস্টে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ১১ মার্চ দুপুরে বাবা সবুজ শেখের কাছে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। সে রাতেই নিজ গ্রাম খোকসার বনগ্রাম পশ্চিম পাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। 

আরও পড়ুন

×