ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কেউ ধারও দিতে চান না সন্তান নিয়ে দিশেহারা

কেউ ধারও দিতে চান না  সন্তান নিয়ে দিশেহারা
×

রনি প্রামাণিক, সিয়াম হোসেন

বগুড়া ব্যুরো

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৪ | ২২:১৩

অসুস্থ শিশুর ওষুধ কিনতে ও পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বের হয়ে গুলিতে নিহত রনি প্রামাণিকের পরিবারের খবর নেয়নি কেউ। তাঁর পাঁচ বছর ও দুই বছর বয়সের দুই সন্তান নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী শামিমা আকতার সাথী। 
প্রায় ১০ দিন হলো রনির মৃত্যুর। তিনি পরিবার নিয়ে সাভারের ডেলটার মোড়ে তিন হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। রনির মৃত্যুর পর সেই বাসা ছেড়ে দুই শিশুসন্তান নিয়ে গরিব এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেছেন তাঁর স্ত্রী। থাকার জন্য আপাতত ব্যবস্থা হলেও ঠিকমতো খাবার জুটছে না তাদের। ধারদেনা করে দুই সন্তানের মুখে আহার তুলে দিতে হচ্ছে। আবার অনেকে ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কায় ধারও দিতে চান না বলে জানিয়েছেন রনির স্ত্রী।

২১ জুলাই রিকশা নিয়ে বের হয়ে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গুলিতে নিহত হন রনি। কোটা আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি ছুড়লে একটি গুলি তার বুকে লাগে। 
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বুড়িগঞ্জ ইউনিয়নের পঞ্চদাস গ্রামের মৃত দিলবর প্রামাণিকের ছেলে রনি। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে ইয়াসিনের বয়স ৫ ও ইভানের বয়স ২ বছর।
রনির স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বামীর মৃত্যুর পর বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন শেষে দুই দিন পর সাভারে ফিরে গেছেন। গ্রামের বাড়িতে খাসজমির ওপর যে ছাপরা (ঝুপড়ি) ঘর আছে সেটি খুবই জরাজীর্ণ। প্রতিবেশীরাও কেউ সহায়তা করতে পারেনি। তাই আবার সাভারে ফিরে গেছেন। কিন্তু  কাজ মিলছে না। চেষ্টা করছেন।
শামিমা আকতার সাথী বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর সবচেয়ে সমস্যা হচ্ছে কোলের সন্তানকে নিয়ে। সবাই বলছে, কোলের সন্তান নিয়ে কাজ করা যায় না, তাই কেউ কাজে নিতে চাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘ছোট ছেলে ইভান সব সময় কান্না করছে আর বাবাকে খুঁজছে। এ অবস্থায় (কাজ না পেয়ে) এখন আমি কী করব, জানি না।’
রনির মৃত্যুর পর সরকার থেকে বা অন্য কোনো জায়গা থেকে কোনো ধরনের সহায়তা পায়নি রনির পরিবার। এমনকি কেউ খোঁজও নেয়নি। যারা বলেছিল সব ব্যবস্থা করে দেবে– তাদের এখন আর পাত্তা নেই বলে জানিয়েছেন রনির স্ত্রী।

রনির রোজগারে চলছিল মা শাহানা খাতুনসহ পাঁচ সদস্যের সংসার। এক দিন রিকশা না চালালে পেটে ভাত জোটে না। ছেলের লাশের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে আসার পর আর ফেরেননি রনির মা। প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতায় চলছেন তিনি।
শাহানা খাতুন জানান, তারা খুবই গরিব। গ্রামের বাড়িতে থাকার ভিটেমাটি পর্যন্ত নেই। খাসজমিতে ঝুপড়ি ঘর করে থাকেন। রনির স্ত্রী ও সন্তানদের থাকার মতো জায়গা নেই। তাই তারা বাধ্য হয়ে ঢাকায় ফিরে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাকে কে ভাত দেবে, তাই আমি যাইনি। গ্রামবাসীরা যে দান-খয়রাত করছে, তা দিয়ে কোনোমতে চলছি।’
প্রতিবেশী বাবলু সরকার বলেন, সবাই মনে করেছিল সরকার সহায়তা দেবে, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পরিবারটি চরম কষ্টে আছে।
আঁচল ধরে ‘মা’ ডাকা সিয়ামের জন্য শাপলা খাতুনের কান্না থামছে না

গুলিতে নিহত সিয়াম হোসেন শুভর মা শাপলা খাতুন সারাক্ষণ ছেলের জন্য কাঁদছেন। সিয়াম তাঁর পালক সন্তান হলেও নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। সাত বছর বয়সে সিয়াম মা-বাবাকে হারিয়ে বগুড়া শহরের সাতমাথা এলাকায় একা একা বসে কাঁদছিল। শাপলা খাতুন সেদিক দিয়ে যাওয়ার সময় সিয়াম তাঁর শাড়ির আঁচল টেনে ধরে মা বলে ডাক দেয়। সেই থেকে নিজের সন্তানের মতো তাকে মানুষ করছিলেন। ছেলেকে হারিয়ে শাপলা বারবার শুধু অতীতের স্মৃতি মন্থর করছেন আর বলছেন, ‘তুই আমারে মা ডেকে মায়ায় ফেলে চলি গেলিরে বাপ। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব।’
সরকারের কেউ বা কোনো জনপ্রতিনিধি খোঁজ নেয়নি জানিয়ে শাপলা খাতুন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমাদের খোঁজ নেওয়ার কে আছে?’
বগুড়া শহরের হাড্ডিপট্টি এলাকার বাসচালক আশিক উদ্দিন ও শাপলা খাতুন দম্পতির পালক ছেলে সিয়াম। সে সারাদিন ভাঙারি কুড়িয়ে সন্ধ্যায় বিক্রি করত। গত ১৯ জুলাই ভাঙারি কুড়িয়ে আসার পর মাকে ভাত দিতে বলে বাইরে বের হয়ে সেউজগাড়ি এলাকায় যায়। সেখানে পুলিশের সাথে আন্দোলনরত ছাত্রদের সংঘর্ষ চলছিল। তখন গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিহত হয় সিয়াম। 

আরও পড়ুন

×