ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঘুমের মাঝেও বাবাকে খুঁজছে ছোট্ট সিনহা

ঘুমের মাঝেও বাবাকে খুঁজছে ছোট্ট সিনহা
×

সাজ্জাদের স্ত্রী ও সন্তান

 স্বপন চৌধুরী, রংপুর

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৪ | ২২:৩৯

বাড়ির পাশে একটি কিন্ডারগার্টেনে পড়ে ছোট্ট সিনহা। একমাত্র সন্তান হওয়ায় পরিবারে আদরের সাগরে ডুবে থাকে পাঁচ বছরের মেয়েটি। তবে তার হৃদয় জুড়ে থাকত বাবার সঙ্গে। সকালে বাবার হাত ধরে পড়তে যাওয়া, একসঙ্গে খাওয়া ও রাতে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানোসহ নানা বায়না শিশুটির নিত্যকাণ্ড। পরম যত্নে এসব আবদার পূরণ করেই গ্রামে হেঁটে হেঁটে সবজি বিক্রি করতেন সাজ্জাদ হোসেন (৩০)। কিন্তু দিন দশেক ধরে মেয়েটি আর মুখে দানাপানি তুলছে না। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকছে, খেতে বসলেও ভাত নিয়ে পিতার জন্য অপেক্ষা করে। তাকে কোনো মতেই বোঝানো যাচ্ছে না যে, একটি গুলি তার বাবাকে চিরতরে বিদায় করে দিয়েছে। আর কোনোদিন চকলেট নিয়ে আসবে না, করবে না আদর।

জানা গেছে, সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদের বাড়ি রংপুর নগরীর পূর্ব শালবন এলাকায়। সাত বছর আগে নগরীর আনছারির মোড় এলাকার জিতু বেগমকে বিয়ে করেন তিনি। মা, স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়েই ছিল তাঁর হাশিখুশির জীবন। অভাব-অনটনের সংসারের চাকা সচল রাখতে রংপুর সিটি বাজারের আড়ত থেকে সবজি কিনে পরদিন পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন সাজ্জাদ। গত ১৯ জুলাই সবজি কিনে আড়ত থেকে ফেরার পথে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ-সহিংসতার শিকার হন তিনি। নগরীর কৈলাশরঞ্জন স্কুলের মোড়ে হঠাৎ একটি গুলি তাঁর ডান পাঁজরে ঢুকে শরীর ভেদ করে বাঁ পাঁজর দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিভে যায় প্রাণপ্রদীপ।

নিহত সাজ্জাদের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, শোকের ছায়া সরেনি তাঁর পরিবারের ওপর থেকে। ছেলে হারিয়ে বুক ফাটিয়ে আর্তনাদ করছেন তাঁর মা ময়না বেগম। স্বামী হারিয়ে স্তব্ধ জিতু। এর মাঝেই সামলাতে হচ্ছে সিনহাকে। নতুন কাউকে দেখলেই সে জানতে চাইছে– ‘আব্বু আসবে না, আমাকে আদর করবে না? চকলেট নিয়ে কখন আসবে? আমাকে পড়তে নিয়ে যাবে না? কোথায় গেছে, কী নিয়ে আসবে?’ তার এমন প্রশ্নবানে জর্জরিত পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু কোনো উত্তর নেই, এটাও তাকে বোঝানো যাচ্ছে না। ঘুমের মাঝেও কেঁদে উঠছে, খুঁজছে বাবাকে।

নিহতের ভগ্নিপতি আলী হোসেন বলেন, ‘ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে সাজ্জাদের ফোন নম্বর থেকে আমার কাছে কল আসে। রিসিভ করতেই একজন জানান, সাজ্জাদ পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। গিয়ে দেখি, একটি গুলি তাঁর শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। রাতেই হাসপাতাল থেকে লাশ বাড়িতে আনা হয়। পরদিন জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।’
নিহতের স্ত্রী জিতু বলেন, ‘ঘটনার দিন মেয়েকে নিয়ে আমি বাবার বাড়িতে ছিলাম। সকাল থেকে সাজ্জাদ সবজি বিক্রি করে বাড়িতে ফিরে গোসল করে নামাজ আদায় করেছে। দুপুরের খাবার খেয়ে পরদিন বিক্রির জন্য সবজি কিনতে আড়তে যায়। সেখান থেকে ফোনে আমাকে শেষ কথা বলেছিল, সবজি বাড়িতে রেখে সন্ধ্যায় তোমাকে আনতে যাব। কিন্তু সেখান থেকে আর জীবন নিয়ে ফেরা হয়নি তার।’ তিনি আরও বলেন, একজন নিরপরাধ-নিরীহ মানুষ সাজ্জাদ জীবনের প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। তাকে কেন গুলি করে হত্যা করা হয়েছে? এর দায় কে নেবে, এই সংসার এখন কীভাবে চলবে? মেয়েটিরইবা ভবিষ্যৎ কী? তার পড়ালেখার খরচ কোথা থেকে আসবে, দু’মুঠো আহারইবা জুটবে কীভাবে? 
সাজ্জাদের মা ময়না বলেন, ‘আমার ছেলের কী দোষ ছিল, তাকে গুলি খেয়ে মরতে হবে! তাকে মেরে ফেলায় পরিবারের একমাত্র আয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ছোট্ট সিনহাসহ আমাদের বেঁচে থাকার কোনো পথই খোলা রইল না।’

আরও পড়ুন

×