বাজারের নাম নিয়ে দ্বন্দ্ব সাড়ে তিন দশক ধরে
ভৈরব (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভৈরবে স্থানীয় বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের দ্বন্দ্ব সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময়ের। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিরা বারবার বসেও বিষয়টির সমাধান করতে পারেননি। প্রেস্টিজ ইস্যুতে পরিণত হওয়া এ দ্বন্দ্ব থেকে ছোটখাটো মারামারির পাশাপাশি অন্তত তিনবার বড় ধরনের সংঘর্ষে জড়িয়েছেন দুই গ্রামের বাসিন্দারা। সবশেষ গত সোমবার সংঘর্ষে নিহত হন দুজন।
নিহত মিরারচর গ্রামের মাসুদ রানা ও হিরণ মিয়ার জানাজা গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে গ্রামের ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে নিহত হিরণ মিয়ার ভাই রতন মিয়া বলেন, আমার ভাই ও আমার প্রতিবেশী বাজারের নামকরণ নিয়ে সংঘর্ষে মৃত্যুবরণ করেছে। আমরা চাই বাজারের নাম হিরণ-মাসুদ বাজার নামে নামকরণ করা হোক।
এ হত্যাকাণ্ডে গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। এদিকে, গতকাল সন্ধ্যায় মিরারচরের একটি গ্রুপ আকবরনগরের কিছু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিতে গেলে তাদের ওপর চড়াও হয় তারা।
নেতারা মীমাংসা করলেও মানে না কেউ
জানা যায়, ১৯৯০ সালের পর থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কের পাশে মিরারচর ও আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দারা বাজার স্থাপন করে ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। তখন থেকেই বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের মানুষদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। তখন এটি মিরারচর বাজার নামে পরিচিতি পায়। তবে আকবরনগর মৌজায় পড়ায় এ গ্রামের বাসিন্দারা এটিকে আকবরনগর বাজার নামে নামকরণ করতে চান। ১৫ বছর আগে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সংঘর্ষ হলে নামকরণের বিষয়টি সামনে আসে। পরে একাধিকবার নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের সংঘর্ষ হয়। কয়েক বছর আগে স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ ভৈরবের সর্বস্তরের নেতারা এসে সিদ্ধান্ত দেন বাজারের নাম দুই গ্রামের নামেই হবে। তখন থেকেই বাজারটিকে মিরারচর-আকবরনগর বাজার নামে ডাকা হচ্ছিল। তবে এ নামও দুই গ্রামের সবাই মেনে নেননি।
গত ২৬ জুলাই স্থানীয় এমপি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম দুই গ্রামের নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে বসে নামকরণের বিষয়টির সমাধানের চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি দুই গ্রামের ১০ জনকে নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি করে তিনদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দেন। তবে ওইদিন রাতেই দুই গ্রামে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরদিন গত সোমবার সকালে শুরু হয় সংঘর্ষ।
দুই পরিবারে শোকের মাতম
নিহত মাসুদ রানা একজন পাদুকা ব্যবসায়ী। তারা তিন ভাই ও এক বোন রয়েছে। মাসুদ রানার পাঁচ কন্যাসন্তানের মধ্যে বড় পিয়সমনি পড়ে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায়। বাকিদের মধ্যে মাইশা ষষ্ঠ শ্রেণিতে, তাইবা ৪র্থ শ্রেণিতে, মাওশি পড়ে প্রথম শ্রেণিতে। ছোট মেয়েটার বয়স ২ বছর। মাসুদ রানার চাচাতো ভাই মো. শাহজালাল মিয়া বলেন, বাজারের নামকরণ নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি দুই গ্রামের সংঘর্ষ। ভৈরবের কোনো নেতা সমাধান দিতে পারেননি। ভবিষ্যতেও মনে হয় দিতে পারবেন না। আরও অনেক মায়ের বুক খালি হবে, অনেক সন্তান পিতৃহারা হবে।
অন্য নিহত হিরণ মিয়ার চাচাতো ভাই রতন মিয়া বলেন, আমার ভাই পুরোনো মোটরসাইকেল কেনাবেচা করত। তার ৪০ দিন বয়সী মেয়ে আনহা ও ১৬ মাস বয়সী আনাবিয়া রয়েছে। আমার ভাই ঠিকমতো বাবা ডাকও শুনতে পারেনি।
হিরণ মিয়ার মা হাফেরা বেগম বলেন, আমার দুইটা নাতনির কী হবে? নাতনি দুইটা এতিম হয়ে গেল। ছেলের বউটা বাচ্চাগুলো নিয়ে কীভাবে চলবে। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মুর্শেদ মিয়া বলেন, আমরা চাই বাজারের নাম দুই গ্রামের নামেই থাকুক। সংঘর্ষে নিহতদের পরিবার যেন বিচার পায় আমরা এলাকাবাসী এটাই চাই।
সোমবার সাড়ে ৫ ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে দুই গ্রামের ১০টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটসহ অগ্নিসংযোগ করা হয়। আহত হন অর্ধশতাধিক। তাদের মধ্যে ২৮ জন ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের ৮ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কিশোরগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিটন মিয়া জানান, এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। মিরারচর গ্রামের একটি অংশে আকবরনগর গ্রামের কিছু মানুষের বসতি রয়েছে। কিছু মানুষ সেই বাড়িগুলোতে আগুন দিয়েছে। প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহায়তায় পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সংঘর্ষে নিহতের ঘটনার পর আকবরনগরের কিছু মানুষ প্রয়োজনীয় আসবাব নিয়ে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে সরে গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, দুই গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এরপরও কিছু তুচ্ছ ঘটনার খবর পেয়েছি। তিনি বলেন, নিহতের ঘটনায় অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
- বিষয় :
- দ্বন্দ্ব