পুষ্প
সুরভিত মধুমালতী
খুলনার জঙ্গল এগ্রি নার্সারিতে ফুটেছে ডবল পাপড়ির মধুমঞ্জরী ফুল লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধুমালতীই মধুমঞ্জরীলতা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মধুমালতী বা রেঙ্গুন ক্রিপার ফুলের নাম দিয়েছিলেন মধুমঞ্জরীলতা। তাঁর বনবাণী কাব্যে তিনি লিখেছিলেন–‘নাম দিয়ে আমি নিলাম আপন করে/ মধুমঞ্জরীলতা’। কাষ্ঠল লতানো গুল্ম প্রকৃতির বহুবর্ষী এ গাছে থোকা ধরা ম্যাজেন্টা-গোলাপি ও সাদা রঙের মিশেলে ফোটা সুগন্ধী ফুলগুলোকেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে মাধবীলতা নামে ডেকে এসেছি। এখন সে ভুল আমাদের ভেঙেছে, আমরা তাকে মধুমঞ্জরীলতা নামে চিনেছি।
মধুমঞ্জরীলতা আমাদের খুব পরিচিত ফুলের গাছ হলেও এর সম্প্রতি নতুন দুটি ধরন এ দেশে এসেছে। একটির গাছ আমাদের চিরপরিচিত মধুমঞ্জরী গাছের মতো অত লম্বা ও অনেক ঝোপাল হয় না, পাতাও তুলনামূলক ছোট, ফুলের রং গাঢ় মেরুন ও সাদা। প্রচলিত মধুমঞ্জরীলতার মতোই একসারি পাপড়িবিশিষ্ট ফুল, পাপড়ি থাকে পাঁচটি। আর এক ধরনের মধুমঞ্জরী এসেছে যার ফুলের পাপড়ি দুই থেকে তিন সারিতে সজ্জিত, পাপড়ি সরু ও লম্বা, পাপড়ির সংখ্যা ১২ থেকে ১৫টি। সকালে ফোটার সময় ফুলের রং থাকে সাদা বা খুবই হালকা গোলাপি। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোলাপি হতে শুরু করে, শেষে হয়ে যায় গাঢ় ম্যাজেন্টা।
অন্য দুরকমের মধুমঞ্জরীলতা ফুলের চেয়ে এ ফুলের ঘ্রাণ বেশি। ফুল ফোটার পর গাছের আশপাশে মধুগন্ধে ভরে ওঠে। গাছও প্রচুর ঝোপাল হয়। ২০১৮ সালে প্রথম এ ধরনের মধুমঞ্জরীলতা ফুল দেখেছিলাম চেন্নাই শহরের ক্যাথিড্রাল রোডের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। তখনও এ দেশে ডাবল পাপড়ির সুরভিত এই মধুমঞ্জরীলতা চোখে পড়েনি। এ দেশে ২০২২ ও ২০২৫ সালের এপ্রিলে দেখি খুলনার জঙ্গল এগ্রি নার্সারিতে।
মধুমঞ্জরীলতার ইংরেজি নাম রেঙ্গুন ক্রিপার এসেছে রেঙ্গুন (বর্তমানে ইয়াঙ্গুন, মিয়ানমার) থেকে, ক্রিপার অর্থ আরোহণশীল বা লতানো এ গাছের এরূপ বৃদ্ধির ধরন ও বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাসের উৎস থেকে এরূপ নামের উৎস।
উদ্ভিদবিজ্ঞানী গেয়র্গ এবারহার্ড রামফিয়াস এই নামটি দিয়েছিলেন একটি ভিন্ন কারণে। তিনি আসলে ঠিক বুঝতে পারছিলেন না যে, উদ্ভিদটির ধরন আসলে কী? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের রং সাদা থেকে গোলাপি, তারপর লালে পরিবর্তন করে। উদ্ভিদটির অস্বাভাবিক পরিবর্তনশীল স্বভাবের কারণে তিনি প্রজাতিগত নামের শেষাংশ দিয়েছিলেন কুইস্কুয়ালিস। পরে অবশ্য সেটি বদলে যায়। মধুমঞ্জরীলতার বর্তমান প্রজাতিগত নাম Combretum indicum পূর্বনাম Quisqualis indica ও গোত্র কমব্রিটেসি।
মধুমঞ্জরী একটি বহুবর্ষজীবী কাষ্ঠল লতানো চিরসবুজ উদ্ভিদ, অন্য গাছ বা অবলম্বনের ওপর লতিয়ে বাড়ে। বাড়তে বাড়তে ৫০ ফুট পর্যন্ত ওঠা মধুমঞ্জরী গাছও দেখেছি। লতা বেশ শক্ত, বয়স হলে কাষ্ঠল ও মোটা হয়ে যায়। লতা থেকে প্রচুর শাখা বের হয়। লতায় বিপরীতমুখীভাবে পাতা সজ্জিত থাকে। পাতা আয়তাকার, ডিম্বাকৃতি ও আগা সরু; কিনারা হালকা ঢেউ খেলানো ও পত্রফলক খসখসে।
ফুলে মধু ও সুগন্ধ আছে, প্রচুর মৌমাছি আসে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বেশি ফুল ফুটলেও অন্য সময়েও ফুল দেখা যায়। কখনও কখনও গাছে উপবৃত্তাকার গাঢ় বাদামি রঙের ফল হয়, ফলে পাঁচটি ডানা থাকে। পরিপক্ব ফলের বীজ খেতে কিছুটা নারকেল ও কাঠবাদাম বা অ্যালমন্ডের মতো স্বাদ লাগে। যে কোনো বাগানে খিলানের ওপর তুলে পুষ্পকুঞ্জ তৈরির জন্য একটি আদর্শ বাহারি ফুলের গাছ।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুলচাষি