বরিশাল
নানা কৌশলে খাসজমির মালিক ভূমি অফিসের কর্মচারীরা
সুমন চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
আড়িয়াল খাঁ নদের তীরে খাসজমিটির আয়তন প্রায় ৫০ একর। এখানে বিশাল মাছের ঘের, গরু-ছাগলের খামার, সবজি ও ফলের বাগান– কি নেই! জমিটি রেকর্ডভুক্ত মো. আকতারুজ্জামানের নামে। তিনি বর্তমানে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বিশাল আয়তনের জমিটি তিনি দখলে নিয়ে মাছের ঘের তৈরি শুরু করেন ২০২৩ সালে। ২০২১ সালে জমিটি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তখন বরিশাল সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তার কার্যালয়ের সার্ভেয়ার (জমি পরিমাপক) পদে ছিলেন। তখনই এসব জমিগুলো অন্যদের নামে বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করেন আক্তারুজ্জামান।
চরবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১ নম্বর খাস খতিয়ানের ৩৯ নম্বর জেএল এর অন্তর্ভুক্ত কাগাসুরা মৌজায় ১৬৮৯ ও ১৭৪১ (শ্রেণি নদী) দুটি দাগ এবং বাট্টা ১৬৭০ থেকে ১৬৯৭ দাগে মোট জমি ৮৫ একর। পুরো জমিটি ২০২১ সালে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় বিভিন্ন নামে। এলাকাবাসী জানায়, ২০২৩ সালে ঘেরের কাজ শুরু করেন আক্তারুজ্জামান। খামার বাড়াতে বাকি জমি পর্যায়ক্রমে দখলে নিচ্ছেন তিনি। খাসজমি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে তাঁর পদোন্নতি আটকে গেছে। একই সময়ে চাকরিতে যোগ দেওয়া ব্যক্তিরা গত বছর কানুনগো পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তবে আক্তারুজ্জামানের হয়নি।
আকতারুজ্জামান দাবি করেন, ঘেরটি তাঁর নয়। তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত দুই একর ৬৭ শতাংশ জমিতে চাচাতো ভাই রিয়াজুল ইসলাম সৈকত ঘেরটি করেছেন। এর বাট্টা নম্বর ৮৬৩, মোট জমির পরিমাণ এক একর ৮৫ শতাংশ। তিনি বলেন, ওই এলাকাটি চরবাড়িয়া ও কাগাশুরা মৌজায়। সেখানে রেকর্ডভুক্ত ও খাসজমি রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অনিয়ম নয়, সার্ভিস বইয়ে ত্রুটি থাকায় পদোন্নতি হয়নি।
খাসজমি নিয়ে ভূমি অফিসের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এমন অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তারা যেমন ভূমিদস্যুদের নামে-বেনামে জমি বরাদ্দ দেন, আবার বিভিন্ন কৌশলে নিজেরাও খাসজমির মালিক বনে যান। এভাবে বরিশাল অঞ্চলে বছরে শত শত একর খাসজমি বেহাত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর নৌবন্দর-সংলগ্ন কীর্তনখোলায় জেগে ওঠা রসুলপুর ও মোহাম্মদপুর চরের হাজারো একর খাসজমি স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা বহু বছর আগে ভাগবণ্টন করে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব দখলের বৈধতা দিতে কাগজপত্র তৈরিতে সহায়তা করেন জেলা প্রশাসনের সাবেক চার সার্ভেয়ার। তারা হলেন– হাবিবুর রহমান, আবু হানিফ, মো. হানিফ ও বজলুর রহমান। তাদের মধ্যে মো. হানিফ মারা গেছেন, বজলুর রহমান এখন অবসরে। পদোন্নতি পেয়ে হাবিবুর রহমান ঢাকায় কানুনগো পদে ও আবু হানিফ পিরোজপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এলএ শাখায় সার্ভেয়ার পদে কর্মরত। এই চারজনই রসুলপুর চরে চারটি বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন।
রসুলপুর চরের চকবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের পাশে দুইতলা ভবনটির মালিক সার্ভেয়ার বজলুর রহমান। একই ভবনের কাছে তিনতলা ভবনের মালিক আবু হানিফ। জানা যায়, বজলুর রহমান বরিশাল জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে ও আবু হানিফ বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখায় কর্মরত থাকাকালে কাগজপত্র তৈরি করে খাসজমি বাগিয়ে নেন। আবু হানিফের ভবনের পাশের দুটি দোতলা ভবনের মালিক হাবিবুর রহমান ও মো. হানিফ।
এসব বিষয়ে বজলুর রহমান ও হাবিবুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সার্ভেয়ার আবু হানিফের ভাষ্য, জমি ও ভবন তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত। অন্য তিনজনের নামে জমি ও ভবন থাকার বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি।
চাকরিচ্যুত হলেও উদ্ধার নেই
গত ২২ জুলাই বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের আদেশে বরিশালের হিজলা উপজেলার ধুলখোলা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী চন্দ্র মালাকারকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ১০৫টি দাখিলার মধ্যে হিজলায় নিজ নামে ও বেনামে প্রায় দুই হাজার একর খাসজমি দখলের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলার তদন্তে তা প্রমাণিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয় বলে নিশ্চিত করেন হিজলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভ্র জ্যোতি বড়াল।
বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা আছমা আক্তারকে গত ৩০ জুন বরখাস্ত করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ছরং ও জম্বুদীপ মৌজার এসএ খতিয়ান রেকর্ড সংশোধন করে শত শত একর খাসজমি বেহাতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। একই অভিযোগে সেদিন বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা পাতাকাটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলায় তোলা অভিযোগ তদন্তেও প্রমাণিত হয়।
ভূমি জালিয়াতির অভিযোগে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বাবুগঞ্জের কানুনগো মো. তফিকুর রহমান ও মাধবপাশা ইউনিয়নের তহশিলদার আব্দুল বারেককে কারাগারে পাঠান বিচারক। এ ছাড়া পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার (প্রেষণে) মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট। তাঁর বিরুদ্ধে ৭৩ একর খাস জমি দখলের অভিযোগ তোলেন বাদী দুদকের সহকারী পরিচালক মো. জাভেদ হাবীব।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার বলেন, সরকারের জমি নিয়ে যেসব ভূমি কর্মকর্তা অনিয়ম করছেন তারা নজরদারিতে আছেন। বিভাগীয় কমিশনার এ অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেছেন। হিজলা উপজেলার একজন ভূমি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর আগে বানারীপাড়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরিই বিষয়গুলো দৃশ্যমান হবে। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে কেউ ছাড় পাবেন না।
- বিষয় :
- খাসজমি