ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত হাওরপারের কৃষক, গোলায় বন্দি ধান
সুনামগঞ্জের ভাটি তাহিরপুর হাওরে ধান কাটতে নামা হারভেস্টার আটকে যায় কাদায়। বুধবার তোলা সমকাল
আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রচলিত প্রবাদের বিপরীত চিত্র এবার তাহিরপুরের হাওরাঞ্চলে। গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ বর্ণনায় সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয় কৃষকের গোলা ভরা ধানের। সেখানে সুনামগঞ্জের এই উপজেলার কৃষকের জন্য গোলা ভরা ধান হয়ে উঠেছে অভিশাপ।
জানা গেছে, তাহিরপুরের হাওরপারের কৃষকের কষ্টার্জিত সোনার ফসল চলতি মৌসুমে গোলায় বন্দি হয়ে আছে। বাম্পার ফলন হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিশেহারা কৃষক। যে ফসল বিক্রি করে পরিবারের বার্ষিক খরচ জোগানো হয়, তা বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। না পেরে পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনের চাকা থমকে গেছে। সন্তানদের লেখাপড়া, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, সাংসারিক খরচ– এমনকি বিয়ে-শাদি পর্যন্ত আটকে গেছে ধান বিক্রি না হওয়ায়। হাওরে এখন ধানের ক্রেতা নেই, আড়তদার বা খুচরা বিক্রেতারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক এবাদুল ইসলাম জানান, এলাকায় ধানের কোনো ক্রেতা নেই। গত বছরগুলোয় কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা এসে বাড়ি বাড়ি থেকে ধান কিনে নিয়ে যেতেন। এবার সেই চিত্র নেই। বাধ্য হয়ে প্রতি মণ ধান মাত্র ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। অথচ গত বছর এই সময়ে ধানের বাজারমূল্য ছিল মণপ্রতি এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা।
কৃষকদের ক্ষোভ, হাওরের ফসল রক্ষায় সরকার প্রতিবছর শতকোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে। কিন্তু সেই কষ্টার্জিত ফসল কৃষকরা যখন পানির দরেও বিক্রি করতে পারছেন না, তখন তা নিরসনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
একই গ্রামের কৃষক লগুছ মিয়া অভিযোগ করেন, সরকারি খাদ্যগুদামে লটারির মাধ্যমে ধান সংগ্রহের বিধান করায় প্রকৃত কৃষকরা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। লটারিতে যাদের নাম উঠছে, তাদের প্রায় ৮০ ভাগ লোকই সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত নন।
তাহিরপুর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হুদা বলেন, কৃষকরা এখন চরম দুর্দিন পার করছেন। যেসব কৃষকের একমাত্র সম্বল ছিল ধান, তারা একেবারেই বেকায়দায় পড়েছেন। মূলত এ বছর টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা সঠিকভাবে ধান শুকাতে পারেননি, চারা গজিয়ে গেছে– যা ধানের দাম পড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, টাকার অভাবে তাঁর ছেলের নির্ধারিত বিয়ে স্থগিত রাখতে হয়েছে। খরচের টাকা জোগাতে ধান বিক্রি করতে গিয়ে দেখেন পাইকাররা মণপ্রতি মাত্র ৮০০ টাকা বলছেন, যার কারণে তিনি ধান বিক্রি করতে পারেননি।
এ বিষয়ে তাহিরপুর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা অবিনাশ দাস বলেন, চলতি মৌসুমে তাহিরপুরে খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার ৫৯৪ টন। সংগ্রহ করা হয়েছে এক হাজার ৫২১ টন। তবে খাদ্য অধিদপ্তরের (সংগ্রহ) নির্দেশে ধান কেনা বর্তমানে বন্ধ রাখা হয়েছে। যার ফলে বাকি ৭৩ টন ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
- বিষয় :
- ধানক্ষেত