ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বানেশ্বর-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়ক

মহাসড়কের কাঁধে চাষ, চলাচলে ঝুঁকি

মহাসড়কের কাঁধে চাষ, চলাচলে ঝুঁকি
×

সড়কের পাশে চাষ করা হলুদ ও কলার বাগান। গত বুধবার চারঘাটের নাওদারা এলাকায় সমকাল

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কের কাঁধ বা রোড শোল্ডার। মহাসড়কের ট্রাফিক লেনের দুই পাশে থাকা এই অংশটি নিছক সৌন্দর্যের জন্য নয়। জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি থামানো, দুর্ঘটনাকবলিত যান সরিয়ে রাখা–এমনকি চলাচলরত যানবাহনের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এটি। 

রাজশাহীর বানেশ্বর-ঈশ্বরদী আঞ্চলিক মহাসড়কের সেই ‘কাঁধ’ দখল করে চাষাবাদ চলছে। কোথাও আদা, কোথাও হলুদ, নেপিয়ার ঘাস, কলা ও পেঁপে চাষ করা হয়েছে। কোথাও তৈরি হয়েছে ঘন ঝোপঝাড়। এতে একদিকে জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি দাঁড় করানোর জায়গা থাকছে না, অন্যদিকে সড়কের বাঁক ও পাশের অংশে দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ায় প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা। রাতের বেলায় এসব ঝোপঝাড়কে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরাও।

রাজশাহীর বানেশ্বর থেকে চারঘাট-বাঘা-লালপুর হয়ে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত ৫৪ কিলোমিটার সড়ককে ২০২০ সালে প্রায় ৫৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আঞ্চলিক মহাসড়কে উন্নীতকরণের কাজ শুরু হয়। পরে জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন কাজে আরও প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের শুরুতে নির্মাণকাজ শেষ হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে রাজশাহীর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন চলাচল করে।

৩৮ কিমিতে বছরে আহত সোয়া ৪ হাজার 
চারঘাট ও বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের চারঘাট ও বাঘা উপজেলার প্রায় ৩৮ কিলোমিটার অংশে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন চার হাজার ২৩৭ জন। একই সময়ে দুই উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৮ জন।
গত ২৭ জুন রাতে বাঘা থেকে অটোরিকশায় বন্ধুদের সঙ্গে রাজশাহী ফিরছিল কিশোর রাফিউল এহসান। রাওথা নুরুল বটতলা এলাকায় সড়কের ওপর ট্রলি রেখে তাতে কাঠ সাজানো হচ্ছিল। অন্ধকারে অটোরিকশাটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে কাঠের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় রাফিউল। এর আগে গত ৭ নভেম্বর বানেশ্বর বাজার থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন শলুয়া এলাকার তুহিন আলী, মারুফ আলী ও শিমুল আলী। শিবপুর এলাকায় সড়কের ওপর একটি ট্রাক রেখে ডাল নামানো হচ্ছিল। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে তিন বন্ধু মারা যান। 

এ সড়কে চলাচলকারী ট্রাকচালক মকসেদ আলী বলেন, ‘সড়কের শোল্ডার ব্যবহার করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে মূল সড়কের ওপর গাড়ি রেখে মালপত্র ওঠানো-নামানোর প্রয়োজন হতো না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমত। আমরা বাধ্য হয়ে সড়কে গাড়ি রাখছি।’ ঝোপঝাড়ের ট্রাফিক সাইনগুলো স্পষ্টভাবে দেখা যায় না বলেও জানান তিনি। 
বাঘা উপজেলার মীরগঞ্জ এলাকার শিক্ষক ফজলুর রহমান বলেন, ‘চারঘাট-বাঘা এলাকায় প্রচুর আম হয়। শত শত ট্রাকে আম ওঠানো হয়। সড়কের পাশে জায়গা না থাকার কারণে সড়কে এসব গাড়ি রাখা হচ্ছে। এতে সড়কে বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি অহরহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। 

শলুয়া গ্রামের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মানিক ইসলাম জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে পাবনা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মালপত্র নিয়ে বানেশ্বর যাচ্ছিলেন তিনি। চারঘাট উপজেলার ফায়ার সার্ভিস মোড় এলাকায় পৌঁছালে সড়কের শোল্ডারে নেপিয়ার ঘাসের ভেতর থেকে তিন ব্যক্তি বের হয়ে তাঁর মালপত্র ছিনিয়ে নেন। চারঘাট উপজেলার ঠিকাদার আব্দুল আওয়ালও একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন। 
বানেশ্বর-ঈশ্বরদী মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও শোল্ডারের কার্যকর অস্তিত্ব নেই। কোথাও কোথাও রীতিমতো শ্রমিক লাগিয়ে ও মেশিন দিয়ে শোল্ডারে চাষ করে ফসল ফলানো হচ্ছে। চারঘাটের নাওদাড়া এলাকার চাষি আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সড়কের পাশে ফাঁকা জায়গা ছিল, এজন্য চাষ করে পেঁপে বাগান ও নেপিয়ার ঘাসের চাষ করেছি। কেউ নিষেধ করেনি। এজন্য চাষের পরিমাণ বাড়িয়েছি। রাস্তার পাশে ছাগল-গরুর অত্যাচার কম। এজন্য ফসল ভালো হচ্ছে। আমার মতো অনেকে আবাদ করছেন।’ 
চারঘাটের হলিদাগাছী থেকে পল্লী বিদ্যুৎ মোড় পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার, কাঁকড়ামাড়ী বাজার থেকে নুরুর বটতলা মোড় পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার জায়গায় রোড শোল্ডার দখল করে চাষাবাদ হচ্ছে। বাঘার মীরগঞ্জ মোড় থেকে মনিগ্রাম বাজার পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার, বাঘা থেকে চণ্ডীপুর তিন কিলোমিটার ও লালপুর থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত ৮টি স্থানে প্রায় ৪ কিলোমিটার জায়গায় রোড শোল্ডারে চাষাবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন বাজার এলাকায় শোল্ডার দখল করে দোকান উঠেছে।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকার শতকোটি টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণ করে রোড শোল্ডার তৈরি করেছে সড়ক নিরাপদ রাখার জন্য। সেই জায়গা যদি দখল করে চাষাবাদ করা হয়, তাহলে এর উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এতে দুর্ঘটনা ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। 
চারঘাট মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুবুর রহমান বলেন, সড়কের দুই পাশ পরিষ্কার থাকলে পুলিশের নিরাপত্তা দেওয়া সহজ হয়। ঝোপঝাড় থাকলে কয়েক মিটার পরের কিছুই দেখা যায় না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। 
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে রাজশাহীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আব্দুল মান্নাফ আকন্দ বলেন, ‘আমরা সড়কের পাশের বাসিন্দাদের বিভিন্নভাবে সতর্ক করছি। তারপরও অনেকে সচেতন না হয়ে সড়কের স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট করছেন। এসব দখলকারীকে তিন দিন থেকে এক সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে তারা নিজেরা এগুলো অপসারণ না করলে সরকারি আইন অনুযায়ী সড়কের শোল্ডার পরিষ্কার করে দেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×