মসজিদের মাইকে ‘ডাকাত’ ঘোষণা দিয়ে যুবলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা
নিহত আনোয়ার হোসেন। ফাইল ছবি-সংগৃহীত
কুমিল্লা ও মুরাদনগর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৫২ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৩২
‘গ্রামে ডাকাত এসেছে, সবাই আসেন’ গ্রামের মসজিদের মাইকে এমন ঘোষণা দিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের এক নেতাকে নিজ বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানের সামনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তির নাম মো. আনোয়ার হোসেন (৪০)। রোববার ভোর ৪টার দিকে জেলার নবগঠিত বাঙ্গরা উপজেলার উত্তর পেন্নাই গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত আনোয়ার শ্রীকাইল ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য এবং একই ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি ওই উপজেলার উত্তর পেন্নাই গ্রামের মৃত মনু মিয়ার ছেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনের পক্ষে কাজ করেন। অন্যদিকে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম সরকারের পক্ষে কাজ করেন। ওই নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলমের কাছে ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন পরাজিত হন। এ নিয়ে ইউপি সদস্য ফিরোজ ও আনোয়ার হোসেনের মধ্যে বিরোধ শুরু হয় এবং ওই সময়ে আনোয়ার হোসেন এলাকা ছাড়েন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি একাধিকবার এলাকায় ফেরার চেষ্টা করেন।
নিহত আনোয়ারের স্ত্রী মোমেনা বেগমের দাবি, প্রায় আড়াই বছর ধরে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে ছিলেন তার স্বামী। শনিবার গভীর রাতে গোপনে তিনি বাড়িতে ফেরেন। বিষয়টি জানতে পেরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেনের নেতৃত্বে একদল লোক দেশীয় অস্ত্র ও লাঠি-সোটা নিয়ে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় আনোয়ারকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তাকেও আহত করা হয়। মোমেনা বেগমের ভাষ্য, হামলার পর ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে এলাকায় ডাকাত পড়েছে বলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। তার আহত স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তাদের আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় সকাল ৬টার দিকে তার স্বামীকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।
মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাজমুস শাকিল বলেন, হাসপাতালে আনার পর পরীক্ষা করে আনোয়ারকে মৃত পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, হাসপাতালে আনার পথেই তার মৃত্যু হয়েছে।
আনোয়ারের চাচাতো ভাই মো. জসিম উদ্দিন বলেন, কিছুদিন আগে গ্রামে ফেরার চেষ্টা করলে ফিরোজ হোসেনের লোকজন আনোয়ারের কাছে মোটা অংকের টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দিলে এলাকায় এলে তাকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল। জসিমের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে আনোয়ারকে হত্যা করা হয়েছে।
আনোয়ারের মেয়ের জামাতা শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার শ্বশুর বাড়িতে আসলে তাকে আওয়ামী লীগের (জাহাঙ্গীর গ্রুপের) নেতাকর্মীরা পিটিয়ে হত্যা করে।
তবে এ ঘটনার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক ইউপি সদস্য ফিরোজ হোসেন জানান, আনোয়ার হোসেন বিগত দিনে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে রাখতো। এতে এলাকার লোকজন তার উপর ক্ষুব্ধ ছিল। গভীর রাতে সে বাড়ি ফিরলে তার প্রতিপক্ষের লোকজন ঘরে ঢুকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে তাকে হত্যা করে।
বাঙ্গরা বাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিউল আলম বলেন, আনোয়ার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় থানায় ৬টি মামলা আছে। ধারণা করা হচ্ছে পূর্ব বিরোধের কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহের ময়নাতদন্তের পর পরিবারের নিকট মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনার তদন্ত চলছে।