‘এক বেলা রাস্তায় নামলে তিন বেলা ব্যথা’
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কগামী নবীগঞ্জ উপজেলার রুদ্রগ্রাম-নবীগঞ্জ বেহাল সড়কের মাঝে সৃষ্ট বিশাল গর্ত। শনিবার তোলা সমকাল
এম. এ আহমদ আজাদ, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ)
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘আউশকান্দির এগুলারে অখন আর রাস্তা মনে হয় না। এক বেলা রাস্তাত গেলে শইল ব্যথা থাকে তিন বেলা। ডেইলি রাইতে ব্যথার বড়ি খাওন লাগে। গাড়ি কী চালাইতায়; হাডনই তো যায় না। আর ভোট আইলে আউশকান্দিত নেতারা পাগল করি দেয়। ভোট গেলেগি কেউ উক্কি মারে না।’
বিগত ২৫ বছর ধরে সংস্কার না হওয়ায় জনপ্রতিনিধিদের ভোট আদায়ের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে নবীগঞ্জ উপজেলার জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো। আউশকান্দি ইউনিয়নের আউশকান্দি-গোরাইরা বাজার এবং রুদ্রগ্রাম-নবীগঞ্জ বেহাল সড়ক নিয়ে এসব কথা বলেন স্থানীয় এক অটোরিকশা চালক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দুটি ব্যবহার করেন উপজেলার অন্তত ২৫টি গ্রামের লাখো মানুষ। স্থানীয় বাজার থেকে আমুকোনা বেতাপুর ঈদগাহ হয়ে দেবপাড়া ইউপির ফরিদপুর এবং মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গোরাইর বাজার পর্যন্ত সড়কটি বর্তমানে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। গ্রাম্যবাজারে পণ্য পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং সদর অংশের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দুটি সংস্কারে কারও দৃষ্টি নেই। এমনটাই অভিযোগ স্থানীয়দের।
আউশকান্দি-গোরাইরা বাজার সড়কে নবীগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এবং শত শত ছাত্রছাত্রী যাতায়াত করেন। পাকা অংশটুকু ভেঙে এখন মেঠোপথে পরিণত হয়েছে।
প্রতিটি স্থানীয় সরকার ও জাতীয় নির্বাচনে এই সড়কের সংস্কার ইস্যু ভোট আদায়ের প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। বিগত ২৫ বছরে বিভিন্ন নির্বাচনে প্রার্থীরা এই সড়ক সংস্কারের আশ্বাস দিয়ে ভোট নিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও প্রার্থীরা পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট প্রার্থনা করলেও নির্বাচন পার হয়ে যাওয়ার পর সংস্কার কাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছে। এদিকে সড়কগুলোতে স্থানীয়দের যাতায়াত চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামের মো. কাজল মিয়া জানান, সড়কটি ভোট আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে প্রার্থীরা ব্যবহার করেন। কিন্তু নির্বাচন চলে গেলে আর মনে থাকে না। অটোরিকশা চালক আমজাদ মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, এটা এখন আর চলাচলের উপযুক্ত নয়। এটা এখন আর সড়ক মনে হয় না।
এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মুকিত জানান, সড়কটি সংস্কারের চেষ্টা চলছে এবং কিছুদিনের মধ্যে কাজ শুরু হবে। আউশকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান দিলাওয়ার হোসেন বলেন, নতুন টেন্ডার তালিকায় সড়কটির নাম দেওয়ার জন্য এমপি ডিও দিয়েছেন এবং চলতি বছরের মধ্যেই কাজ হবে বলে তিনি আশাবাদী।
নবীগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি কর্মকর্তা সাব্বির আহমদ জানান, সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিশেষ প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে এবং এমপি মহোদয় এটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সম্পন্ন করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।
এদিকে নবীগঞ্জ-রুদ্রগ্রাম সড়কের বেহাল দশায় ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখো মানুষ। এক অটোরিকশা চালক বলেন, এক দিন গাড়ি চালালে তিন দিন যায় গায়ে ব্যথা; প্যারাসিটাল খেতে হয় রাতে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গে নবীগঞ্জ শহরের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের ১০ কিলোমিটার অংশজুড়ে চরম পরিস্থিতি। সামান্য বৃষ্টিতেই খানাখন্দ ও বড় বড় গর্তে পানি জমে মরণফাঁদে পরিণত হওয়া এই সড়কটি দেখলে বোঝার উপায় থাকে না, এটি পাকা রাস্তা, নাকি গ্রামের কোনো মেঠোপথ। এলাকাবাসী মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার পানিউমদা, গজনাইপুর, দেবপাড়া ও বাউসা ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের চলাচলের প্রধান মাধ্যম এই সড়ক। এই পথ দিয়েই শাহ তাজ উদ্দিন কুরেশী (রহ.) উচ্চ বিদ্যালয়, ধুলচাতল তাজিয়া মোবাশ্বীরিয়া আলিম মাদ্রাসা, দিনারপুর কলেজ, দিনারপুর উচ্চ বিদ্যালয়, দিনারপুর দাখিল মাদ্রাসা, পানিউমদা রাগীব-রাবেয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা যাতায়াত করেন। একমাত্র বাইপাস সড়ক হওয়ায় ট্রাক, অটোভ্যান, অটোরিকশা ও প্রাইভেটকার এক সময় ব্যাপক চলাচল করলেও বেহাল দশার কারণে এখন যান চলাচল খুবই সীমিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি সংস্কার করা হলেও অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তা এক বছরও টেকেনি। সংস্কারের এক মাস পর থেকেই রাস্তা ভাঙতে শুরু করেছিল। বর্তমানে নবীগঞ্জ-রুদ্রগ্রাম ১০ কিলোমিটার সড়কের আইনগাঁও, ভরপুর, চৌধুরী বাজার, বাউসা বাজার, বাউসা পয়েন্ট, বাউসা মাদ্রাসা পয়েন্ট, নাদামপুর মাদ্রাসা পয়েন্ট, রিফাতপুর ও শিবপাশা এলাকার কোথাও পাকা সড়কের লেশমাত্র নেই।
এসব স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে সৃষ্টি হওয়া বড় বড় গর্তে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি ও কাদামাটি জমে থাকে। যার ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
বাঁশডর গ্রামের সিএনজি চালক মহসিন আলী জানান, নবীগঞ্জ-রুদ্রগ্রাম সড়কের বেহাল অবস্থা। একদিন গাড়ি চালালে তিন দিন যায় গায়ে ব্যথা, রাতে প্যারাসিটামল খেতে হয় গায়ের ব্যথার জন্য। সড়কটি দ্রুত সংস্কার করা হলে জনসাধারণ অনেক উপকৃত হবে।
দিনারপুর কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক তনুজ রায় জানান, বিভিন্ন কাজে উপজেলা সদরে যেতে হয় নবীগঞ্জ-রুদ্রগ্রাম সড়ক হয়ে। বৃষ্টিতে সড়কের বড় বড় গর্তে পানি জমে যাওয়ায় মানুষের খুবই কষ্ট হয়। নিম্নমানের কাজ হওয়ায় সড়ক সংস্কারের এক মাস পর থেকে ভাঙতে শুরু করে। এখন একেকটা ভাঙন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
লাল সবুজ যুব সংঘের সভাপতি হুমায়ুন কবির আজিম বলেন, সড়কটি সংস্কারের জন্য মানববন্ধন করে ইউএনওকে জানালেও সম্পূর্ণ সড়ক সংস্কার হয়নি। ফলে তাদের এলাকার ছাত্র-জনতা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের প্রকৌশলী সাব্বির আহমদ জানান, নবীগঞ্জ-রুদ্রগ্রাম সড়ক সংস্কারে ইতোমধ্যে হবিগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে ঢাকায় প্রাক্কলন অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
- বিষয় :
- সড়ক