ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আশুলিয়ায় বিস্ফোরণ

অরক্ষিত ছিল কাভার্ড ভ্যানবোঝাই সিলিন্ডার, ৫ বছর আগেই মেয়াদ শেষ

অরক্ষিত ছিল কাভার্ড ভ্যানবোঝাই সিলিন্ডার, ৫ বছর আগেই মেয়াদ শেষ
×

 গোবিন্দ আচার্য্য, সাভার 

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার প্রীতি গ্রুপের এফএনএফ পোশাক কারখানা চত্বরে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী কাভার্ডভ্যান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার নামানোর সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে মারা যান ৭ জন। তবে বিস্ফোরক পরিদপ্তর বলছে, নিয়মনীতি না মেনে গ্যাস সিলিন্ডার কাভার্ডভ্যানে অরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল। ফলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। 

গত রোববার রাত পৌনে ৭টার দিকে জামগড়া এলাকার প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড চত্বরে ভয়াবহ গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে মৃত ৭ জনের মধ্যে ৫ জনের এখনও পরিচয় মেলেনি। পুড়ে যাওয়া কাভার্ডভ্যানের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া ৫ লাশের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।   

ঝুঁকিপূর্ণভাবে কারখানায় এভাবে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার বিষয়ে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক (ঢাকা) মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান জানান, গ্যাস ব্যবহারের এ পদ্ধতি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এলপিজি সিলিন্ডারগুলো লো প্রেশারের, যেখানে এসব সিলিন্ডার নেক হাই প্রেশারের। এভাবে অরক্ষিত অবস্থায় গ্যাস সিলিন্ডার বহন কিংবা সরবরাহ করা দেশের কোনো আইন বা বিধানে অনুমোদিত নয়। 
তিনি বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। কারও কারও লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম সংকট এবং ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় সেভাবে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। 

‘ভেবেছিলাম বজ্রপাত, বাইরে তাকিয়ে দেখি ভয়াবহ আগুন’ 
সন্ধ্যা পৌনে ৭টা। হঠাৎ বিকট শব্দ। প্রথমে ভেবেছিলাম, বাইরে মনে হয় বৃষ্টি। তাই বজ্রপাত হচ্ছে। কিন্তু জানালা খুলে বাইরে তাকাতেই দেখি আমাদের পোশাক কারখানার ভবনের বাইরে বাউন্ডারির ভেতরে ফাঁকা জায়গায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পার্কিং করা কয়েকটি কাভার্ডভ্যানসহ ৬/৭টি গাড়িতে আগুন ধরে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও পোশাক কারখানার ভবনের বাইরে, তবুও কাজে থাকা আমরা ৩ শতাধিক শ্রমিক আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সবাই ছোটাছুটি করে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাইরে এসে দেখি আগুনের ভয়াবহ তীব্রতা। 

এভাবেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের সময়ের ঘটনার বর্ণনা দেন প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানায় সপ্তম তলায় কাজ করা ফিনিশিং বিভাগের মান নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিদর্শক রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পর বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারের মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বের হওয়ার সময় অনেক শ্রমিক আহত হন।

ওই পোশাক কারখানার শ্রমিক শিল্পী আক্তার বলেন, এখানে ৬ থেকে ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। যদি এ আগুন কোনোভাবে পোশাক কারখানায় ছড়িয়ে পড়ত, তাহলে কত বড় বিপদ হতো! শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক 
অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রত্যক্ষদর্শী জামগড়া এলাকার ৪৫ বছর বয়সী আরিফা বেগম জানান, প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানায় একেবারে কাছেই পশ্চিম পাশে রয়েছে আমার তিনতলা বাড়ি ‘খান মঞ্জিল’। ঘটনার সময় আমি নিজ কক্ষে বসে ছিলাম। হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখি ভয়াবহ আগুন। বিকট শব্দে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো আকাশে উড়তে থাকে।

তিনি আরও বলেন, বিস্ফোরণের পর উড়ে আসা সিলিন্ডারের একটি অংশ আমার বাড়ির তিনতলার ছাদের কিছু অংশ উড়িয়ে দেয়। এতে ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভয়াবহ বিস্ফোরণে আমার বাড়ির জানালার কাচগুলো সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে। ছাদের একাংশ ধসে পড়ায় পানির ট্যাঙ্ক ও পাইপলাইন সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। ছাদে থাকা গাছপালাও পুড়ে যায়। দ্রুত নিচে নামার সময় উড়ে আসা সিলিন্ডারের একটি অংশের আঘাতে আমার পা কেটে যায়। 

প্রীতি গ্রুপ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য 
ক্যাভার্ডভ্যান ভর্তি গ্যাস সিলিন্ডারে আগুন লাগার ঘটনায় সোমবার দুপুরে কারখানার পক্ষ থেকে প্রধান ফটকে জরুরি বিবৃতি সংযুক্ত করে প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড। এতে জানানো হয়, রোববার সন্ধ্যায় আনুমানিক পৌনে ৭টার দিকে আমাদের কারখানার মূল প্রাঙ্গণ ও উৎপাদন স্থাপনা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি স্থাপনা কারখানার সম্মুখভাগে অবস্থিত এফএনএফ ইউটিলিটি বিল্ডিং-সংলগ্ন এলাকায় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বিবৃতিতে বলা হয়, অত্যন্ত দুঃখজনক, ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী এলাকায় পরিবহন কার্যক্রমে নিয়োজিত কয়েকজন বহিরাগত শ্রমিক হতাহত হয়েছেন। তবে আমাদের কারখানার কোনো শ্রমিক বা কর্মচারী এ ঘটনায় হতাহত হননি। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পুনর্বাসনে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। 

মামলা হয়নি, লাশ মর্গে
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় থানায় এখনও মামলা হয়নি, তবে প্রক্রিয়াধীন। এ পর্যন্ত ৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে এবং একজনের লাশ রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে।  

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি
পাঁচ বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছিল প্রীতি গ্রুপের এস সুহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিলিন্ডার পরীক্ষা করে এমন তথ্য পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিভাগীয়ভাবে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থলের আশপাশে পড়ে থাকা সিলিন্ডার পরীক্ষা করে দেখা যায়, একটি সিলিন্ডারের গায়ে ইংরেজিতে লেখা– ‘ডোন্ট ইউজ আফটার ২০২১’। অর্থাৎ ২০২১ সালের পর সেটি ব্যবহার না করার নির্দেশনা ছিল। অথচ ওই সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছিল।

জিরাব ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন বলেন, কারখানাটিতে তিতাসের গ্যাস সংযোগ রয়েছে। তবে লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডারবাহী লরি থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হতো। প্রাথমিক অনুসন্ধানে লরিতে থাকা কয়েকটি সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত কমিটি করেছে বিজিএমইএ
প্রীতি গ্রুপের কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান এবং ভবিষ্যতে সিলিন্ডার খালাসের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ত্রুটি খতিয়ে দেখতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করছে বিজিএমইএ। গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের সব তৈরি পোশাক কারখানায় কেমিক্যাল, গ্যাস সিলিন্ডার ও দাহ্য পদার্থ খালাস, হ্যান্ডলিং এবং সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রটোকল কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য বিজিএমইএর পক্ষ থেকে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

আহতদের দেখতে হাসপাতালে এলজিআরডি মন্ত্রী
আশুলিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহতদের খোঁজ নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান। এ সময় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর সঙ্গে ছিলেন। গতকাল হাসপাতাল দুটিতে চিকিৎসাধীনদের খোঁজ নেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এলজিআরডি মন্ত্রী। এ সময় অগ্নিকাণ্ডে নিহত নজরুল ইসলামের পরিবারের হাতে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা তুলে দেন তিনি।

 

আরও পড়ুন

×