জীববৈচিত্র্য
শামুকখোল এখন উলিপুরের ‘স্থায়ী বাসিন্দা’
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার উলিপুর গ্রামের গাছে শামুকখোল পাখির দেখা মেলে সমকাল
এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল, তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ)
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকাল হতেই গাছ থেকে ভেসে আসে পাখির ডাক। এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে যায় ঝাঁকে ঝাঁকে শামুকখোল। কোথাও ডানার ঝাপটা, কোথাও কিচিরমিচির শব্দ। গাছের নিচে দাঁড়ালে চোখে পড়ে ডালে ডালে সাদা-ধূসর পাখি, তাদের বাসা আর ছানাদের আনাগোনা। সন্ধ্যা নামার আগেও একই দৃশ্যের দেখা মেলে। পাখির কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে পুরো গ্রাম।
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিলঘেঁষা উলিপুর গ্রামের এখন এটাই নিত্যদিনের চিত্র। প্রায় ৫২ বিঘা আয়তনের পুরোনো একটি দিঘিকে ঘিরে গড়ে ওঠা গ্রামটি গত কয়েক বছরে পরিচিতি পেয়েছে ‘পাখির গ্রাম’ নামে। তবে অন্য সব পাখিকে ছাপিয়ে এখন উলিপুরের প্রধান বাসিন্দা যেন শামুকখোল।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় এক দশক আগে উলিপুর দিঘির পাড়ের কয়েকটি বড় গাছে শতাধিক শামুকখোল আশ্রয় নিয়েছিল। সঙ্গে ছিল বালিহাঁস, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ আরও কয়েক প্রজাতির পাখি। দিনের বেলায় আশপাশের বিল, জলাশয় ও কৃষিজমিতে খাবার খেয়ে রাতে তারা দিঘির পাড়ের গাছগুলোতে ফিরে আসত। নিরাপদ আশ্রয় আর পর্যাপ্ত খাবারের কারণে ধীরে ধীরে শামুকখোলের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
এরপর শুরু হয় বাসা বাঁধা। গ্রামের বট, পাকুড়, তেঁতুল, কড়ই, মেহগনিসহ বড় বড় গাছে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়তে থাকে পাখিগুলো। ডিম ফুটে জন্ম নেয় নতুন ছানা। এভাবেই কয়েক বছরের মধ্যে শামুকখোলের সংখ্যা কয়েক গুণ হয়ে যায়। এখন গ্রামের অনেক গাছই যেন তাদের স্থায়ী আবাস।
শামুকখোল সারসজাতীয় বড় জলচর পাখি। এরা সারস পরিবারের (Ciconiidae) সদস্য। শামুকখোলের বৈজ্ঞানিক নাম Anastomus oscitans। ইংরেজিতে বলে Asian Openbill। ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর বিস্তৃতি রয়েছে। বাংলাদেশেও দেশের বিভিন্ন বিল, হাওর, জলাভূমি ও কৃষিজমিতে এদের দেখা যায়। খাবার ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এরা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল করে। তবে শামুকখোলকে বাংলাদেশের সাধারণ পরিযায়ী পাখি হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বাংলাদেশ বন বিভাগের পাখির লাল তালিকায় এটিকে ‘সাধারণ আবাসিক পাখি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শামুকখোল দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, প্রকৃতির জন্যও তেমনি উপকারী। ধবধবে সাদা বা ধূসর দেহের এই পাখির পাখা ও লেজের শেষাংশ কালো। লম্বা পা গোলাপি বা লালচে হয়। শামুক, ঝিনুক, ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ, বিভিন্ন জলজ প্রাণীসহ নানা ধরনের পোকামাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। চলনবিলের জলাভূমিই শামুকখোলের জন্য যেন খাবারের বিশাল ভান্ডার। বর্ষায় বিল, ডোবা-নালা ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত খাবার মেলে। ফলে খাবারের সন্ধানে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না পাখিগুলোকে। দিনের খাবার শেষে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে তারা ফিরে আসে উলিপুরে।
শামুকখোল পাখির এই নিরাপদ আবাস ধরে রাখার পেছনে বড় ভূমিকা গ্রামটির বাসিন্দাদের। উলিপুরের গৃহবধূ নাসরিন সুলতানা বৃষ্টি (২৮) জানান, বিয়ের পর প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি এ গ্রামে আছেন। শুরুতে পাখির সংখ্যা কম ছিল। গত পাঁচ-ছয় বছরে তা অনেক বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে কেউ পাখি শিকার করে না। পাখির দিকে ঢিলও ছোড়া হয় না। কোনো ছানা বাসা থেকে পড়ে গেলে গ্রামের মানুষ সেটিকে তুলে আবার বাসায় রেখে দেয়।’
৫০ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষক বাবুল আকতার বলেন, ‘প্রথম দিকে পাখি খুব বেশি ছিল না। গত কয়েক বছরে শামুকখোলের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন গ্রামের অধিকাংশ বড় গাছেই তাদের দেখা যায়।’
তিনি জানান, গত ৯-১০ বছরে শামুকখোল, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ আরও নানা প্রজাতির পাখির সহাবস্থান ছিল। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে শামুকখোলের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আশ্বিন মাসে এই পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। এরা গ্রামের বিভিন্ন গাছে বাসা বেঁধে ডিম দেয় ও ডিমে তা দিয়ে ছানার জন্ম দিতে থাকে। তখন থেকে বালিহাঁস, পানকৌড়ি, মাছরাঙাসহ অন্যান্য নানা প্রজাতির পাখির সংখ্যা কমে যায়। আর গ্রামের প্রায় অধিকাংশ গাছে শামুকখোলে ভরে ওঠে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, শামুকখোল প্রকৃতির জন্য উপকারী পাখি। শামুক, পোকামাকড়, ব্যাঙ ও ছোট মাছ খেয়ে তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। চলনবিলে বছরের প্রায় পাঁচ মাস শামুকখোলের উপযোগী খাবার পাওয়া যায়। উলিপুরে নিরাপদ আবাস ও পর্যাপ্ত খাবার থাকায় পাখিগুলো এখানে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছে।
তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, তিনি একাধিকবার উলিপুরের পাখির গ্রাম পরিদর্শন করেছেন। তাঁর মতে, গ্রামের মানুষের পাখিপ্রেম ও দায়িত্বশীল আচরণের কারণেই কয়েক বছর ধরে শামুকখোলসহ বিভিন্ন পাখি এখানে নিরাপদে অবস্থান করছে। কয়েক মাস পর পাখিগুলো অন্যত্র চলে গেলেও আবার ফিরে আসে।
- বিষয় :
- জীববৈচিত্র্য