ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অপ্রতিম হত্যা

ভিন্ন কারণও দেখছে পরিবার, তদন্তের দাবি

ভিন্ন কারণও দেখছে পরিবার, তদন্তের দাবি
×

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম

 কুমিল্লা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নিতে তাকে পাহাড়ে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার কথা বলেছে পুলিশ। তবে ঘটনার পেছনে অন্য কারণও দেখছেন তার মা নাহিদা বেগম। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী প্রক্টর থাকাকালে কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্যকে পুলিশে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁর স্বামীর প্রতিষ্ঠানে হত্যার ১০ দিন আগে এক কিশোর চাকরি নিয়েছিল। দুই ঘটনাকে তিনি সন্দেহ করছেন।  

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে গতকাল সোমবার সকালে মানববন্ধন করে শিক্ষক সমিতি। কর্মসূচি চলাকালে বক্তব্য দেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামরুন নাহার। কর্মসূচিতে অপ্রতিমের মা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম থাকতে না পারায় তাঁর পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি।

অপ্রতিমের মায়ের বরাত দিয়ে কামরুন নাহার বলেন, অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সালমানপুর এলাকার ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে চাকরি নিয়েছিল। এ ছাড়া সহকারী প্রক্টর থাকাকালে ড. নাহিদা এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় সহায়তা দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। তাদের মধ্যে দুজন অপ্রতিম হত্যা মামলার আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিনের গ্যাংয়ের সদস্য ছিল। এই দুই ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

কামরুন নাহার আরও বলেন, হত্যা মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং যাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে দাবি করা হচ্ছে, তারা আদৌ অপ্রাপ্তবয়স্ক কিনা, তা ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে হলেও অপরাধীদের যেন উপযুক্ত সাজা নিশ্চিত করা হয়।
সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শোক র‍্যালি ও মানববন্ধনের আয়োজন করে শিক্ষক সমিতি। র‍্যালিটি শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বর থেকে শুরু হয়ে প্রশাসনিক ভবন ও মূল ফটক প্রদক্ষিণ করে ফের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে এসে শেষ হয়।

র‍্যালিতে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার, প্রক্টর ড. মো. আবদুল হাকিম, শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক ড. শামীমা নাসরিনসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা। এ সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অপ্রতিম হত্যায় সরাসরি জড়িত তুহিন (১৯), ১৫ ও ১৬ বছরের দুই কিশোর এবং জড়িত সন্দেহে মো. সিয়ামকে (১৯) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিয়াম বাদে অন্য তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। 

পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে গ্রেপ্তার আসামিরা আইনফোনের জন্য এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করলেও মাদক, অর্থ ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও তদন্তে আনা হচ্ছে। যাচাই করা হচ্ছে আসামিদের মোবাইল কল লিস্ট। আসামিদের কারা আশ্রয় দিয়েছে, হত্যার পর কারও কোনো সহায়তা ছিল কিনা, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোটবাড়ী সালমানপুর এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, অপ্রতিম বয়সে ছোট হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সন্তান হওয়ায় এলাকার একদল কিশোরের সঙ্গে সখ্য ছিল। এক কিশোরকে ধার দেওয়া টাকার জন্যও চাপ দিচ্ছিল অপ্রতিম। এ জন্য ঘাতকরা তার ওপর হয়তো ক্ষুব্ধ ছিল। বেশ কিছু ছবিতে ঘাতকদের সঙ্গে অপ্রতিমের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। ওরা প্রায়ই মোটরসাইকেল নিয়ে কুবি এলাকায় ঘুরত। অনেকেই ধারণা করছেন এমন অসম বন্ধুত্ব তাকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিয়েছে। 

তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলেন, হত্যার পরও আসামিরা সামাজিক মাধ্যমে সরব ছিল। তারা বাসায় গিয়ে পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়। তুহিনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পরও তার মোবাইলে এক কিশোরের বারবার কল আসছিল। মরদেহ উদ্ধারের সময়ও এক কিশোর লাইভে ছিল। 

রোববার দুপুরে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানান। শুক্রবার কুবি-সংলগ্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হন অপ্রতিম। পরদিন কুবির অদূরে একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। 
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তিন আসামিকে পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ ও তিন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যার কথা বললেও এর নেপথ্যে অর্থ কিংবা কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতা ছিল কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অপ্রতিমের বাবা-মায়ের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক হলে এ বিষয়ে আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলব।’ 

বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি 
২০০৬ সালের ২৮ মে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। এর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি উঠলেও ২০ বছরেও সেখানে ফাঁড়ি স্থাপন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, দীর্ঘ ২০ বছরে এলাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে লালমাই-ময়নামতি পাহাড় এলাকায় খুন, ধর্ষণ, চুরি ছিনতাই, যৌন হয়রানিসহ নানা অপরাধজনক কর্মকাণ্ড ঘটছে। গত ৩০ আগস্ট লালমাই পাহাড়ের সাধেরমুড়া এলাকায় এক কিশোরীকে পাঁচ বন্ধু দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। সর্বশেষ গত শুক্রবার স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যার পর সেখানকার নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক সোহেল বলেন, ‘কুমিল্লায় একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হওয়ায় আমরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পুরো ক্যাম্পাসকে অবিলম্বে সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনতে হবে।’ 

গ্রেপ্তার দুই কিশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে
অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চারজন‌ের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) পাঠানো হয়েছে। গতকাল বি‌কেল ৪টায় গ্রেপ্তার দুই কিশোরকে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আনা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিশু উন্নয়ন কে‌ন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান।

এমরান খান সমকালকে জানান, কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুই কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আনা হয়। যে শিশু হত্যার ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, সেই ঘটনার জন্য তাদের মধ্যে অনুশোচনার কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি। প্রিজনভ্যান থেকে নামানোর পর তারা বেশ স্বাভাবিক ছিল। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাদের নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে খাবার দেওয়া হলে তারা স্বাভাবিকভাবেই খাবার খায়।

শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি 
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২০ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক। কোয়ালিশন মনে করে, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধারের জন্য দ্রুত অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

আরও পড়ুন

×