উত্তরের গ্রামে লোকগানে মুগ্ধ রাষ্ট্রদূত
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার আরাজি দেওডোবা গ্রামে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’র কার্যক্রম পরিদর্শন করেন নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন। এ সময় তিনি এক শিক্ষার্থীর হাত থেকে বেহালা নিয়ে বাজানোর চেষ্টা করেন। গত সোমবার তোলা। ছবি- সমকাল
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
টিনে ঘেরা বাড়ির উঠানে ব্যস্ত একদল শিশু-কিশোর। কারও হাতে একতারা, কারও হাতে দোতারা, কেউ বাঁশিতে তুলছে সুর, আবার কেউ তবলার তালে মেলাচ্ছে হাত। কখনও ভেসে আসছে ফকির লালনের গান, কখনও বাউল, মুর্শিদী, মারফতি, ভাওয়াইয়ার সুর। শহরের কোলাহল আর প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক আয়োজনের বাইরে গ্রামের মাটিতে এভাবে নতুন প্রজন্মের হাতে বেঁচে উঠছে আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি।
এই শিশুদের কণ্ঠে গান শুনতে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম আরাজি দেওডোবায় ছুটে গেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন। গত সোমবার তিনি গ্রামটিতে যান। সেখানে শিশুদের কণ্ঠে গান শোনার পাশাপাশি দোতারা, একতারা, সারিন্দা, বাঁশি, তবলাসহ বিভিন্ন দেশীয় বাদ্যযন্ত্রে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেখেন।
জানা গেছে, শিশু-কিশোরদের নিয়ে প্রায় এক দশক ধরে এই সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে ‘মায়ের তরী’ নামের সংগঠন। দেওডোবায় প্রধান ঠিকানা হলেও এ উদ্যোগ এখন লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রাম ও চরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে দুই জেলায় ‘মায়ের তরী’র ৯টি গুরুগৃহে পাঁচ শতাধিক শিশু লোকগান শিখছে। দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রায় ১২৫ জন শিশু শিখছে দোতারা, একতারা, বাঁশি, বেহালা, তবলা, খমক, সারিন্দাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। সব মিলিয়ে ছয় শতাধিক শিশু এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত।
‘মায়ের তরী’র গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নরওয়ের নাগরিক লেখক, লোকগবেষক, আলোকচিত্রী ও কবি উয়েরা সেথেরের নাম। তিনি ১৯৯৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে দক্ষিণ নামাজের চর এলাকায় বন্যা-পরবর্তী মানুষের জীবন দেখতে গিয়ে চরের নারীদের কণ্ঠে মারফতি ও মুর্শিদী গান শুনে মুগ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে বাংলার লোকগানের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে স্থানীয় শিল্পী ও সংগঠকদের নিয়ে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মায়ের তরী’।
গত সোমবার সেই সংগঠনের কার্যক্রম দেখতে দেওডোবা গ্রামে এসে মুগ্ধ হন নরওয়ের রাষ্ট্রদূত। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নরওয়ে দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন আলেকজান্ডার ফাল্ক-বিল্ডেন, প্রোগ্রাম অফিসার শাহপার সেলিম। এ সময় আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গুঞ্জন বিশ্বাসসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
‘মায়ের তরী’র কাজের প্রশংসা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু একটি দেশের অতীতকে ধারণ করে না, মানুষে মানুষে সম্পর্ক তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রান্তিক শিশুদের সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরি এবং স্থানীয় লোকগান ও বাদ্যযন্ত্রের ধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
‘মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, তাদের উদ্দেশ্য শুধু শিশুদের গান শেখানো নয়; লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে তাদের জীবনবোধ, মানবিকতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা।
সংগঠনের অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীরের ভাষ্য, এখানে অধিকাংশ শিশুই আসে প্রান্তিক পরিবার থেকে। অনেকের শহরে গিয়ে সংগীত শেখার সুযোগ নেই। কোনো কোনো গুরু প্রায় স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে শিশুদের প্রশিক্ষণ দেন। নিজেদের সময়, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে তারা ধরে রাখছেন লোকসংগীতের ধারাবাহিকতা। ফলে সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মধ্যেও কার্যক্রমটি এগিয়ে চলছে।
- বিষয় :
- রাষ্ট্রদূত