ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শান্তিরক্ষা মিশনে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু

‘ছেলে বলেছিল—মা, দেশে ফিরলে আর কোনো অভাব থাকবে না’

‘ছেলে বলেছিল—মা, দেশে ফিরলে আর কোনো অভাব থাকবে না’
×

গঙ্গাদেবী চাকমা

সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৫৩

বুকে চেপে ধরে আছেন প্রিয় সন্তানের ছবি। আর অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বৃদ্ধা মা গঙ্গাদেবী চাকমা বলছেন, ‘মা, আমি দেশে ফিরলে তোমার আর কোনো কষ্ট থাকবে না। সব অভাব পূরণ করে দেব। তোমাদের জন্য বড় একটি টেলিভিশন কিনে দেব...।’ দেশে ফিরে মায়ের সব অভাব ঘোচানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া ছেলে ফিরছেন ঠিকই, তবে জীবন্ত নয়, নিথর দেহ হয়ে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্য ট্রোম্যান খীসা। আজ বুধবার রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের দুর্গম রামহরি পাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলের ছবি বুকে নিয়ে আহাজারি করছেন মা। তাঁর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।

ট্রোম্যান খীসার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো গ্রামে। গ্রামের একমাত্র নৌবাহিনীর সদস্য ছিলেন তিনি। তাঁর মা-বাবা গ্রামে থাকেন। স্ত্রী রূপা চাকমা ও দুই মেয়ে চট্টগ্রাম শহরের নেভি কলোনিতে থাকেন।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ট্রোম্যান ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে দক্ষিণ সুদানে যান তিনি। চলতি বছরের ডিসেম্বরে মিশন শেষ করে দেশে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু তার আগেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারান তিনি।

ট্রোম্যানই ছিলেন বৃদ্ধ মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই মেয়ের সংসারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আয়েই বাবা-মায়ের ওষুধসহ পরিবারের অন্যান্য খরচ এবং দুই মেয়ের পড়াশোনা চলত। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ট্রোম্যানের বাবা সুবিমল খীসা বলেন, ‘গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে ছেলে সর্বশেষ ভিডিও কলে কথা বলেছিল। আমাদের ভালো আছি কিনা জানতে চেয়েছিল। সে নিজেও ভালো আছে বলেছিল। টেলিভিশন কিনতে চেয়েছিলাম। ছেলে বলেছিল, এখন কিনতে হবে না, সে দেশে এসে কিনে দেবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি ডায়াবেটিস ও প্রেসারের রোগী। নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। ছেলে ওষুধের টাকা ও হাতখরচ পাঠাত। ছেলে নেই, এখন এসব টাকা কে দেবে?’

ট্রোম্যান খীসার স্ত্রী রূপা চাকমা বলেন, স্বামীর মৃত্যুতে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবেন, তা বুঝতে পারছেন না।

ট্রোম্যানের চাচা কল্যাণ কুমার খীসা জানান, ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে এক আত্মীয় ফোন করে ট্রোম্যানের খোঁজ জানতে চান। পরে তিনি ট্রোম্যানের মৃত্যুর খবর দেন। খবরটি শুনে তিনি ভাইয়ের বাড়িতে যান। সেখানে স্বজনদের কান্নায় নিজেও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন ট্রোম্যান। তাঁর স্ত্রীকে যোগ্যতা অনুযায়ী নৌবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

বুড়িঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ট্রোম্যানের চাচা প্রমোদ খীসা বলেন, নৌবাহিনীর কাছ থেকেই তাঁরা ট্রোম্যানের মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছেন, তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছাতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। মরদেহ এলে গ্রামের পারিবারিক শ্মশানে শেষকৃত্য করা হবে।

তিনি বলেন, ‘ট্রোম্যানের উপার্জনের ওপরই তাঁর পরিবার ও মা-বাবা নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি অত্যন্ত অসহায় হয়ে পড়েছে। পরিবারটি যাতে ভবিষ্যতে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারে, সরকারকে সে ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাই।’

এদিকে নৌবাহিনীর ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বার্তায় জানানো হয়েছে, দক্ষিণ সুদানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ট্রোম্যান খীসার মৃত্যু হয়েছে। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে নৌবাহিনী। বার্তায় বলা হয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের গৌরবময় অবদানে ট্রোম্যান খীসার আত্মত্যাগ অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

স্বজনদের দাবি, দেশের ও বিশ্বের শান্তির জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারানো ট্রোম্যানের পরিবারের পাশে সরকার দাঁড়াক। তাঁর স্ত্রীকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি এবং দুই মেয়ের পড়াশোনা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

×