ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঐতিহ্য

কারাম উৎসবে মাতল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ

কারাম উৎসবে মাতল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ
×

কারাম উৎসবে ঢোলের তালে তালে নৃত্য পরিবেশনা। গতকাল বুধবার নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর হাই স্কুল মাঠে- সমকাল

 নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাঠের মাঝখানে পুঁতে রাখা হয়েছে কারাম গাছের ডাল। সেই ডাল ঘিরে ঢোল ও মাদলের তালে নাচছেন সমতলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার এক দল নারী-পুরুষ। মুখে তাদের ঝুমুর গানের সুর। নৃত্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গল্প বলছেন। নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলার নজিপুর হাই স্কুল মাঠে দেখা মিলল এমন দৃশ্যের। কারাম উৎসব উপলক্ষে গতকাল বুধবার এই আদিবাসী সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলার আয়োজন করা হয় সেখানে।

অনুষ্ঠানে পত্নীতলা ছাড়াও মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, পোরশা, ধামইরহাট উপজেলাসহ আশপাশের অর্ধশতাধিক সাংস্কৃতিক দল অংশ নেয়। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখা এ আয়োজন করে। সহযোগিতা করে অ্যাসেড ফাউন্ডেশন ও রুমিয়া প্রফেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট।

অবশ্য উৎসবের শুরু এক দিন আগে। মঙ্গলবার উপজেলার বুজরুক মামুদপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় কারাম পূজা। দিনভর উপোস থাকার পর সন্ধ্যায় গ্রামের এক দল কিশোরী কারাম গাছের ডাল কেটে এনে পূজার বেদিতে স্থাপন করে। এরপর দিয়াবাতি, জাওয়া ডালি ও ফলমূল উৎসর্গ করা হয় কারাম দেবতার উদ্দেশে।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পূজাস্থলে ভিড় বাড়ে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ জড়ো হন সেখানে। পুরোহিত কিচ্ছার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেন কার্মা ও ধার্মা– দুই ভাইয়ের কাহিনি। কিচ্ছা শেষে নারীরা পরস্পরকে খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়ে উপোস ভাঙেন। পরে কারাম ডাল ঘিরে শুরু হয় নাচ-গান।

বুধবার ধর্মীয় বিভিন্ন আচার শেষে গান গাইতে গাইতে কারাম ডাল নিয়ে আসা হয় নজিপুর হাই স্কুল মাঠে। সেখানে নির্ধারিত স্থানে সেটি পুঁতে দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাংস্কৃতিক দল কারাম ডাল ঘিরে নাচ ও গান পরিবেশন করে। সবশেষে মাঠ থেকে কারাম ডাল তুলে আত্রাই নদীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে কারাম মূলত ফসলকেন্দ্রিক উৎসব; ডালপূজা নামেও পরিচিত এটি। ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষে এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। করম দেবতার উপাসনার মাধ্যমে জমির উর্বরতা ও ফসলের ভালো ফলনের জন্য প্রার্থনা করেন তারা।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ পত্নীতলা উপজেলা শাখার সভাপতি সুবোধ ওঁরাও বলেন, আদিবাসীদের সব উৎসব, পালাপার্বণ প্রকৃতি ঘিরে। কারাম ডাল ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। নতুন ফসল বপনের আচার প্রকৃতির সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের কথাও মনে করিয়ে দেয়। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, সহযোগিতা ও ঐক্যের বন্ধনই সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
পত্নীতলা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক যোগেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ সংস্কৃতিপ্রিয় ও সংস্কৃতিবান্ধব। নওগাঁর ১১টি উপজেলার মধ্যে ১০টিতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। তাদের প্রধান উৎসবের একটি কারাম। এটি সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রাচীন একটি অনুষ্ঠান।
স্থানভেদে কারাম পর্ব পাঁচ থেকে সাত দিন পর্যন্ত চলে। সাঁওতাল, ওঁরাও, মাহাতো, পাহান, মাহালীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী নিজেদের রীতি ও বিশ্বাস অনুযায়ী এ উৎসব পালন করেন।
তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখা সহজ হচ্ছে না। অর্থ সংকটের কারণে অনেক এলাকায় আগের মতো নিয়মিত আয়োজন হয় না। তাই ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি কারাম উৎসবকে সাংস্কৃতিক পরিচয় টিকিয়ে রাখার মাধ্যম হিসেবেও দেখছেন আয়োজকরা।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ১৯৯৬ সাল থেকে কারাম পূজা ঘিরে নওগাঁসহ সমতলের বিভিন্ন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সম্মেলনের আয়োজন করে আসছে। আয়োজকদের ভাষ্য, গান, নাচ, কিচ্ছা ও নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে তাদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতি।
গতকাল উৎসব উপভোগ করেন ইউএনও রিফাত আরা, অভিনেতা ড্যানি সিডাক, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গণি শোভন, অ্যাসেড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুরাদ হোসেন প্রমুখ।

আরও পড়ুন

×