ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পচা সুপারি এখন শিল্পের কাঁচামাল

পচা সুপারি এখন শিল্পের কাঁচামাল
×

রাজারহাট উপজেলার দিনোবাজার এলাকায় সুপারি বাছাইয়ে ব্যস্ত শ্রমিকরা সমকাল

 আসাদুজ্জামান আসাদ, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) 

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় গাছ থেকে ঝরে পড়ে মাটিতে পচে যাওয়া সুপারি ছিল কৃষকের কাছে সম্পূর্ণ মূল্যহীন ও ফেলনা। সেই পরিত্যক্ত সুপারি এখন কুড়িগ্রামের রাজারহাটে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ঝরে পড়া পচা সুপারি সংগ্রহ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করে প্রতি মাসে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় সরবরাহ করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকাররা। ফেলে দেওয়া এই পণ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, স্বাবলম্বী হচ্ছেন বহু প্রান্তিক নারী ও পুরুষ।

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন গ্রামের হকাররা বসতবাড়ির আঙিনা ও বাগান থেকে ঝরে পড়া পচা সুপারি সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে হাটে নিয়ে আসেন। রাজারহাট উপজেলার দিনোবাজারে এখন নিয়মিত বসছে শুকনো পচা সুপারির এই পাইকারি হাট। শুধু এ বাজারে ১১ জন ব্যবসায়ী নিয়মিত এ ধরনের সুপারি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। প্রতিমাসে হকারদের কাছ থেকে ৫০ টন সুপারি সংগ্রহ করেন তারা। মানভেদে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে এসব সুপারি কিনে পরিষ্কার ও বাছাই করা হয়। পরে তা ট্রাকযোগে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে। ব্যবসায়ীদের মতে, প্রক্রিয়াজাত এই পচা সুপারি প্রধানত বাণিজ্যিক রং প্রস্তুতকারক কারখানা এবং অন্যান্য রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামে প্রায় ১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে সুপারির বাগান রয়েছে। ফলন আহরণের পাশাপাশি ঝরে পড়া পচা সুপারি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে অপচয় কমছে এবং তৈরি হচ্ছে বিকল্প আয়ের সুযোগ। সুপারি প্রক্রিয়াজাতকরণ, শুকানো ও বাছাই কাজের সঙ্গে কেবল দিনোবাজারেই শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন, যার বেশির ভাগই নারী। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও অর্ধশতাধিক লোক এ পেশায় জড়িত রয়েছেন।
রাজারহাটের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ টন পচা সুপারি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছেন, যা থেকে তাঁর মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকা নিট লাভ থাকছে। কাজের সুবাদে শ্রমিকদেরও নিয়মিত উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পচা সুপারি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবনে এসেছে এক বড় পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের বেকারত্ব দূর করে স্বাবলম্বী হয়েছেন ব্যবসায়ী সুজা মিয়া। তিনি বলেন, ‘বছরের প্রায় ছয় মাস এই ব্যবসা চলে। আগে আমি বেকার ছিলাম। এই ব্যবসা শুরু করার পর থেকে এখন বেশ ভালোভাবে দিন কাটছে।’
এই ব্যবসা কেবল উদ্যোক্তাদের ভাগ্য বদলায়নি, তৈরি করেছে ব্যাপক কর্মসংস্থানও। আরেক সফল ব্যবসায়ী লাভলু মিয়া জানান, ‘এই ব্যবসা শুরু করার মাধ্যমে আমি নিজে যেমন উপার্জন করছি, তেমনি এলাকার প্রায় ১০০ জন শ্রমিকের জীবিকার পথ উন্মুক্ত করতে পেরেছি। এটাই আমার বড় তৃপ্তি।’

এই কর্মসংস্থানের সুফল সরাসরি পাচ্ছেন স্থানীয় নারী শ্রমিকরা। তেমনি একজন শ্রমিক সাগরিকা তাঁর স্বস্তির কথা জানিয়ে বলেন, ‘আগে কাজের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো। এখন বছরের ছয়টা মাস স্থায়ীভাবে এখানে কাজ পাই। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতে পারছি, যা আমার সংসার চালাতে সাহায্য করছে।’ ছাটবান্ধা এলাকার নারী শ্রমিক রেণুবালা বলেন, ‘আগে বসে থাকতাম, এখন এই সুপারি বাছাই ও শুকানোর কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পাচ্ছি। সংসার খুব সুন্দরভাবে চলছে।’
তবে এই উদীয়মান খাতকে আরও আধুনিক ও লাভজনক করতে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র বা ঋণসুবিধা প্রয়োজন। পচা সুপারির এই বাণিজ্যিক ব্যবহার কেবল কৃষকের অপচয় কমাচ্ছে না, স্থানীয়ভাবে ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সরকারিভাবে তাদের ঋণ ও আধুনিক ড্রায়ার মেশিন দিয়ে শুকানোর প্রযুক্তি দেওয়া গেলে এই বাণিজ্য বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী এই নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘যে সুপারি একসময় নর্দমায় ফেলনা ছিল, তা এখন কৃষকের বাড়তি আয়ের পথ তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়াজাত বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে কৃষক, ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক শ্রমিক–সবাই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তবে সম্ভাবনাময় এ খাতটিকে 
আরও আধুনিক ও সম্প্রসারিত করার কোনো সরকারি উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি আক্ষেপ করে জানান, ‘আপাতত এ ধরনের কোনো নতুন পরিকল্পনা বা প্রকল্প আমাদের হাতে নেই।’
 

আরও পড়ুন

×