ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাবি শিক্ষার্থীকে সাপের কামড়: হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি

রাবি শিক্ষার্থীকে সাপের কামড়: হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি
×

ফাইল ছবি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৭

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলে ঘুমন্ত অবস্থায় এক শিক্ষার্থীকে বিষধর কালাচ সাপে কামড় দেওয়ার ঘটনায় হল প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন রাকসু নেতা ও শিক্ষার্থীরা। রোববার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ১৩৮ নম্বর কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীকে সাপে কামড় দেয়।

আহত নুরনবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। সাপে কামড় দেওয়ার পর প্রথমে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হয়। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়।

এই ঘটনার পরে বেলা ১১টার দিকে শিক্ষার্থী ও হল সংদের নেতারা প্রাধ্যক্ষের কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরে দুপুর ২টার দিকে প্রশাসন ভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন তারা। এ সময় তাদের সঙ্গে সংহতি জানায় রাকসু নেতারা।

তাদের দাবি, হলের চারপাশে দ্রুত স্নেক নেট স্থাপন, হলের চারপাশের ঝোপঝাড় ও আবর্জনা পরিষ্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার, খাবারের মানোন্নয়ন, ওয়াশরুম পরিষ্কার এবং আবাসিক শিক্ষার্থীদের সিটসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান।

বিক্ষোভের সময় তারা, ‘প্রভোস্টের পদত্যাগ চাই’, ‘জঙ্গলমুক্ত হল চাই’, ‘সিট নিয়ে প্রহসন বন্ধ কর’, ‘খাবারের মান বৃদ্ধি কর’, ‘ওয়াশরুম পরিষ্কার কর’ এবং ‘কতজন মরলে হল প্রশাসনের টনক নড়বে’—এমন স্লোগান লেখা পোস্টার ও লিফলেট দেখা যায়।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান আশিক বলেন, হলের চারপাশের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিষয়টি হল প্রশাসন ও প্রভোস্টদের জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

হল সংসদের ভিপি আশিকুর রহমান সোহাগ বলেন, হলের ড্রেনেজ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় পানি জমে থাকে এবং ড্রেন দিয়ে সাপ হলে ঢোকে। হলের চারপাশের জঙ্গল পরিষ্কারেও পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংকট রয়েছে। স্নেক নেট স্থাপনের দাবি জানানো হলেও নিম্নমানের নেট দেওয়ায় তা বারবার পরিবর্তন করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, রুমের ভেতরে যদি শিক্ষার্থীরা নিরাপদ থাকতে না পারে, তাহলে আমাদের একটাই প্রশ্ন—হল প্রশাসন সেখানে কী করে। আমরা শিক্ষার্থীদের সব দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানাচ্ছি।

এর আগে বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল আছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রউপদেষ্টা এএইচএম খুরশিদ আলম।

নয় মাসে ৮০ সাপ উদ্ধার
চলতি বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন আবাসিক হল, শিক্ষক কোয়ার্টার ও বিভিন্ন একাডেমিক ভবনসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ৮০টির বেশি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত দুই মাসেই ২০টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আবাসিক হলগুলোর আশপাশে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ঝোপঝাড় পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা হলেও সাপের উপদ্রব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এতে রাতের চলাফেরা ও কক্ষে থাকার ক্ষেত্রেও অনেকে আতঙ্কে থাকছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেভ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড ন্যাচার’ (সোয়ান) রাবি শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান থেকে রান্নাঘর, আবাসিক হলের কক্ষ, জুতার ভেতর, একাডেমিক ভবনের ল্যাব, এসি থেকে মোট ২০টি সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়াও চলতি বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৮২টি সাপ উদ্ধার করা হয়। 

স্থানভিত্তিক হিসেবে গত দুই মাসে, আবাসিক হল থেকে ৮টি, একাডেমিক ভবন এলাকা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের আবাসিক কোয়ার্টার থেকে ৬টি করে সাপ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ১৭টি নির্বিষ এবং ৩টি বিষধর। বিষধর সাপগুলোর মধ্যে রয়েছে ১টি খৈয়া গোখরা ও ২টি কালাচ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর একই হলের ১২১ কক্ষে মশারির ওপর থেকে আরও একটি কালাচ সাপ উদ্ধার করা হয়। যদিও কাউকে কামড়ানোর আগেই সাপটি উদ্ধার করা হয়। এছাড়া গত গত ২৮ আগস্ট নির্মাণাধীন বিজয়-৭১ হল থেকে একটি খৈয়া গোখরা উদ্ধার করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম তানবীর বলেন, ক্যাম্পাসে সাপের নিয়ন্ত্রণ ও উপদ্রব রোধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত প্রতিনিয়ত ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখা এবং নিয়মিত কার্বলিক অ্যাসিড ছেটানো। প্রতিনিয়ত সাপের দেখা মেলায় শিক্ষার্থীরা এক ধরনের মানসিক ট্রমা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন রাবি শাখা সোয়ানের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ শেখ বলেন, গত দুই মাসে আমরা বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ থেকে ২৪ টি সাপ উদ্ধার করেছি। এর মধ্যে দুইটি কালাচ ও একটি খৈয়া গোখরা ছিল। এ ছাড়াও এই বছরে ৮০টি সাপ উদ্ধার করা হয়।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাপ না মেরেই উদ্ধারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক বাসস্থান বিনষ্ট হওয়ায় সাপের উপদ্রব বাড়লেও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাপের অস্তিত্ব প্রয়োজন। তাই সাপ দেখলে না মেরে সঠিক পদ্ধতিতে উদ্ধার করা উচিত। 

এ বিষয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শাহ হুসাইন আহমাদ মাহদী বলেন, বৃষ্টি ও বর্ষায় সাপের প্রাকৃতিক বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি বছরগুলোতে অনেক প্রাকৃতিক বাসস্থান হওয়ার মতো এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে এবং কয়েকটি ছোট বনায়ন কেটে ফেলা হয়েছে। এতে সাপের বাসস্থানের ওপর প্রভাব পড়ছে। এ ছাড়াও রয়েছে খাবারেরও সংকট। যে এলাকায় খাবার পাওয়া যায়, সেখানে চলে আসছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের প্রাকৃতিক বাসস্থান ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করার পাশাপাশি আবাসিক এলাকাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

অ্যান্টিভেনম নেই চিকিৎসাকেন্দ্রে
সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাপের উপদ্রব বাড়লেও বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেই কোনো অ্যান্টিভেনমের ব্যবস্থা। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা মাফরুহা সিদ্দিকা লিপি বলেন, ‘বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনো অ্যান্টিভেনম নেই। প্রশাসনের সাথে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। যেহেতু সাপের উপদ্রব বাড়ছে, আমরা দ্রুতই অ্যান্টিভেনমের ব্যবস্থা করব।’ 

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি। বর্ষার মৌসুম হওয়ায় ক্যাম্পাসে ঝোপঝাড় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে সাপের আনাগোনাও কিছুটা বেড়েছে। উপদ্রব কমাতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদারের পাশাপাশি হলের চারপাশে কার্বলিক অ্যাসিড ছিটানোর জন্য সব হল প্রাধ্যক্ষদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

×