পরিচালন ব্যয় বাড়লেও কমছে যাত্রী, সংকটে ট্রলার মাঝিরা
খুলনার দাকোপের চালনা লঞ্চঘাটে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকা লঞ্চ সমকাল
মো. মহিদুল ভূঁইয়া শিপন, দাকোপ (খুলনা)
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২০ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে খুলনার দাকোপে নদীপথে ট্রলারের পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সম্প্রতি তেলের খরচ এতটাই বেড়েছে যে, ট্রলার মাঝিরা জীবিকার তাগিদে দিনমজুরি বা বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। পর্যাপ্ত যাত্রী না মেলায় পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। বঙ্গোপসাগর উপকূলে ৩টি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত দাকোপ উপজেলা। ট্রলার মাঝিদের ভাষ্য, এক সময় এ উপজেলার নদীপথে প্রচুর যাত্রী মিললেও এখন আগের মতো যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না।
ট্রলার মালিক ও মাঝিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুন্দরবন-সংলগ্ন কালাবগী থেকে চালনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৪১ কিলোমিটার। দীর্ঘ এই নদীপথে যাত্রীবাহী ছোট-বড় ২৯টি ট্রলার চলাচল করে। এই রুটে এক ট্রিপে জ্বালানি হিসেবে প্রায় ৮ থেকে ৯ লিটার ডিজেল খরচ হয়। যখন প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা ছিল তখন এই রুটে যাত্রী ভাড়া ছিল জনপ্রতি ৮০ টাকা। বর্তমানে ১৩৫ টাকা দরে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে দূরত্ব অনুযায়ী যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ টাকা ভাড়া বেশি নিতে হচ্ছে। বর্তমানে কালাবগী থেকে চালনা পর্যন্ত প্রতিটি ট্রলারে মাত্র ২০ থেকে ২৫ জনের মতো যাত্রী পাওয়া যায়। এত কম যাত্রী নিয়ে ট্রলার চালালে লোকসানের মুখে পড়তে হয়। ট্রলার চালিয়ে আয় হোক বা না হোক, প্রতিদিন চালককে ৬৫০ টাকা এবং সহযোগীকে ৫০০ টাকা হাজিরা দিতে হয়। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে বর্তমানে এই নৌ রুটের অধিকাংশ ট্রলার মালিক পরিচালনা কার্যক্রম বন্ধ রেখেছেন। বর্তমানে এই রুটে মাত্র ৮-৯টি ট্রলার চলাচল করছে।
ট্রলারচালক সুজিত মণ্ডল, গফ্ফার হোসেন গাজী, আব্দুল্লাহ গাজী, এলাহী বক্স, খালেক ও বিধান সরদার জানান, আগে উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় এই নৌ রুটে প্রচুর যাত্রী হতো। এখন সড়ক যোগাযোগ আগের চেয়ে ভালো হওয়ায় যাত্রীরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন। এ কারণে নদীপথে যাত্রী সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। ফলে ট্রলার চালিয়ে ডিজেলের খরচ ওঠানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আয় না থাকায় ট্রলারের মাঝিরা চরম হতাশায় ভুগছেন। অনেকেই জীবন-জীবিকার তাগিদে ট্রলার চালানো ছেড়ে বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।
কালাবগী থেকে সড়ক পথে চালনার উদ্দেশ্যে আসা ব্যবসায়ী আকবর সরদার জানান, কালাবগী থেকে ট্রলারে যাতায়াত করলে খরচ ও সময় দুটোই বেশি লাগে। আগে সড়ক যোগাযোগ ভালো না হওয়ায় বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়ায় ট্রলারে যেতেন। এখন খরচ বাঁচাতে তিনি সড়ক পথে যাতায়াত করছেন।
কালাবগী-চালনা রুটের ট্রলারচালক বকুল মল্লিক বলেন, ‘এক সময় এই নদীপথে প্রচুর যাত্রী হতো, ট্রলার চালিয়ে আমরা লাভবান হতাম। বর্তমানে বর্ষা মৌসুম ছাড়া যাত্রীরা আর নদী পথে সময় নষ্ট করতে চান না। ডিজেলের দাম বাড়ায় যাত্রী আরও কমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ট্রলার ডাঙায় তুলে রেখে দিনমজুরি করা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
চালনা লঞ্চঘাটের রিজার্ভ ট্রলার মালিক মো. জাফর হাওলাদার জানান, তেলের দাম বাড়ায় ট্রলারের ভাড়াও বেড়েছে। এখন আর আগের মতো ট্রলার রিজার্ভ হয় না। গত দুই দিন ধরে কোনো যাত্রী পাননি তিনি। বাধ্য হয়ে তিনিও দীর্ঘদিনের এই পেশা ছেড়ে বিকল্প কাজের চিন্তাভাবনা করছেন।
চালনা বাজারের খুচরা ডিজেল ব্যবসায়ী নিমাই সাহা জানান, দাম বৃদ্ধির আগে খুলনা যমুনা ডিপো থেকে ২০০ লিটারের এক ব্যারেল ডিজেল কেনা হতো ২২ হাজার ৩০০ টাকায়, যা এখন কিনতে হচ্ছে ২৬ হাজার ৩০০ টাকায়। এর ওপর খুলনা থেকে চালনা পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি পরিবহন খরচ হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। দাম বাড়ায় তাদের বিক্রিও কিছুটা কমেছে।
এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে কোনো ব্যবসায়ী মজুত রাখা তেল অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছেন কিনা, তা তদারকি করতে বাজারে নিয়মিত মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- ট্রলার
- জ্বালানি তেল