মবের শিকার হাজার শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
শ্রেণিকক্ষে জীববিজ্ঞানের ক্লাস নিচ্ছিলেন বরিশালের গৌরনদীর শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কণিকা মুখার্জী। হুড়মুড় করে কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ একটি মব শ্রেণিকক্ষে ঢোকে। শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়। কণিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হয় অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল। নানাভাবে হেনস্তা করা হয় তাঁকে। পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সেদিন নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাণ নিয়ে কোনোমতে বের হতে সক্ষম হন তিনি।
কণিকা মুখার্জীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিনি ওই মবের শিকার হন। কয়েক দিন পর বিদ্যালয়ে গিয়ে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েন। কণিকা জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে তাঁর প্রাণ হারানোর আশঙ্কা করছিলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কণিকার মতোই সারাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল-কলেজে বহু শিক্ষক মবের শিকার হন। তাদের মধ্যে সহস্রাধিক শিক্ষক এখনও নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের একটি সংগঠন এ দাবি করেছে।
দুই বছর পার হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসের কাছে মব বা জোরজবরদস্তির মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া কিংবা হেনস্তার শিকার শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া বা পদত্যাগে বাধ্য করার তথ্য উঠে এসেছে। পুনর্বহালের দাবিতে আট শতাধিক শিক্ষক আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর দাবি, সারাদেশে প্রায় দুই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক হয়রানি, অপমান, পদত্যাগে বাধ্য হওয়া কিংবা কর্মস্থল থেকে বিতাড়নের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন। জোটের দাবি, শারীরিক ও মানসিক আঘাতের জেরে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সারাদেশে বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৮ হাজার। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ।
পদত্যাগপত্রে সই, তারপর বেতনও বন্ধ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পতনের পর সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল এবং প্রতিষ্ঠানেরই কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উস্কে দিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করেন। কোথাও তোলা হয় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ বা পদ-পদবি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা নিয়মতান্ত্রিক তদন্তের বদলে অনেক ক্ষেত্রে নেওয়া হয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের সামনে এনে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদারের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। ২০২৩ সালে ধামরাই উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এবং একই বছর শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচিত হন। আনোয়ারুলের ভাষ্য, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কয়েকজন শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উস্কে দেন। এরপর ১১ আগস্ট কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। পরদিন প্রায় ১৫ জনের একটি দল মিরপুরে তাঁর বাসায় গিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়।
আনোয়ারুলের দাবি, প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি ক্লাসে কড়াকড়ি আরোপ করেছিলেন। প্রাইভেট-কোচিংনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অপ্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করেছিলেন। এসব কারণে কয়েক শিক্ষকের বিরাগভাজন হন তিনি।
অপমানের চিত্র ভিডিওতে
রাজধানীর উত্তর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তারের ক্ষেত্রেও একটি ভিডিওতে একদল শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজনকে তাঁর কক্ষে অবস্থান নিয়ে পদত্যাগের জন্য চাপ দিতে দেখা যায়। ভিডিওতে কয়েকজন তাঁর হাত এবং পোশাক ধরে টানাটানি করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এক পর্যায়ে তাঁর হাতে কলম ধরিয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর দৃশ্যও দেখা যায়।
বাড্ডার আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আয়শা আক্তারের কক্ষে শিক্ষার্থী ও এক দল বহিরাগত ঢুকে তাঁকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করে এবং পরে তাঁকে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি শিক্ষা বোর্ডের চিঠি নিয়ে কর্মস্থলে যোগ দিতে গিয়ে আবারও হেনস্তার শিকার হন বলে অভিযোগ। ভিডিওতে কয়েকজনকে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বিদ্যালয়ের বাইরে বের করে দিতে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ভিকারুননিসায় মব
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানেও মব সৃষ্টি করে অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট এই মব সৃষ্টি করেন ভিকারুননিসার প্রাক্তন কিছু শিক্ষার্থী ও কয়েকজন শিক্ষক। জানা গেছে, প্রাক্তন দুজন শিক্ষার্থী স্কুল থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা না পেয়ে এই মবে নেতৃত্ব দেয়। কয়েকজন শিক্ষক তাতে সহযোগিতা করেন, যাতে ভবিষ্যতে তাদের পথে আর কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সেদিন বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মব চলে।
ড. ফারহানা খানম সমকালকে বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। তাঁকে বাধ্য করা হয়েছিল। কেকা রায় চৌধুরী একই দাবি করেন। পরে তারা উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেন। আদালতের আদেশের পরও তারা যোগদান করতে পারেননি। কারণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আপিল করেছে।
ঢাকা জেলায় মবের শিকার দুই শতাধিক
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর ঢাকা জেলাতেই দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক পদত্যাগ, অপসারণ, বরখাস্ত কিংবা কর্মস্থলে বাধার মুখে পড়েন। তাদের মধ্যে রয়েছেন খিলগাঁও গভর্নমেন্ট স্টাফ কোয়ার্টার হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সরদার মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বনানী মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক কাজী শফিকুল ইসলাম, বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক ড. মো. ইদ্রিস আলী, রামপুরা একরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসনে আরা, জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ এস এম আব্দুল খালেক, গুলশান মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ এম মুস্তফা জামান মিয়াসহ অনেকে।
চাকরি হারিয়ে আর্থিক সংকটে
চাকরি হারানোর পর অনেকে আর্থিক সংকটে পড়ে বিপর্যস্ত। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে বেতন পাওয়ায় জোরপূর্বক পদত্যাগের পর তাদের অনুপস্থিত দেখিয়ে উপস্থিতির তালিকা পাঠানো হলে এক পর্যায়ে বেতন বন্ধ হয়ে যায়।
পুরান ঢাকার এক প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ভাষ্য, চাকরি হারানোর পর আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। টাকার অভাবে এমনকি তাঁর মেয়ের বিয়ের আয়োজনও পিছিয়ে দিতে হয়। ধামরাইয়ের এক প্রধান শিক্ষক জানান, তাঁর নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান থেকে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে এসে এখন চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠানপ্রধান সরানোর পর অনেক জায়গায় পছন্দের শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নেই
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর ১৫ জানুয়ারি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। এতে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া শিক্ষকদের কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেতন-ভাতা চালু রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়। যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হবে না, তাদের চাকরিতে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও তখন নেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনার আলাদা তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে চাকরিতে পুনর্বহালের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এখনও যোগ দিতে পারেননি, তারা স্থানীয় প্রশাসন ও জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহযোগিতা নিতে পারেন।
পদচ্যুত চার শিক্ষকের মৃত্যু, নানা প্রশ্ন
‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর দাবি, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও হেনস্তার পর শারীরিক ও মানসিক আঘাত, হতাশা ও অসুস্থতার মধ্যে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন– চট্টগ্রামের হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ এস এম আইয়ুব, ঢাকার দোহার উপজেলার জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ এস এম আব্দুল খালেক; বগুড়ার সারিয়াকান্দির দুর্গাহাটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম শফিক এবং ফেনীর সাউথ ইস্ট কলেজের অধ্যক্ষ পরমেশ চন্দ্র।
এর মধ্যে জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁর পরিবার ও সহকর্মীদের দাবি, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি হতাশায় ভুগছিলেন।
হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
জোরপূর্বক পদত্যাগের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এসেছে। একটি মামলায় ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের আইনি বৈধতা নেই উল্লেখ করে গাজীপুরের সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, সভাপতিকে অপসারণ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধানের এমপিও বন্ধসহ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।
‘শিক্ষককে অপমান মানে শিক্ষাব্যবস্থাকে অপমান’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিষয়টিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান করা শুধু ব্যক্তিকে আঘাত করে না; পুরো শিক্ষাব্যবস্থার মর্যাদাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাঁর মতে, কোনো শিক্ষক অযোগ্য হলে বা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত কিংবা অন্য কোনো কারণে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান করা গুরুতর অন্যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, এ ঘটনায় শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, বের করে দেওয়ার অপমানের পর বেতন, ভাতা ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার দাবিতে অনেক শিক্ষক রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছেন। এতে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
সাত জেলায় ফিরতে পারেননি ৪৫ জন
সমকালের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ ও মৌলভীবাজারের ৬৫ স্কুল-কলেজের ৬৬ জন শিক্ষক মবের শিকার হন। তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানে ফিরেছেন ২১ জন। আজও ফিরতে পারেননি ৪৫ জন।
সারাদেশের আরও কিছু চিত্র
জেলা শিক্ষা প্রশাসনের তথ্য ও স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, রাজবাড়ী, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, কিশোরগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এমন বহু ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কেউ প্রশাসনিক উদ্যোগে বা আদালতের নির্দেশে স্বপদে ফিরেছেন। আবার অনেকে এক থেকে দুই বছর ধরে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।
বগুড়ায় ২৭ প্রতিষ্ঠানপ্রধান মবের শিকার
বগুড়ায় ২৭টি স্কুল-কলেজের প্রধানকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মবের শিকার হতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৬ জন স্বপদে ফিরেছেন। ১১ জন এখনও ফিরতে পারেননি। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রমজান আলী আকন্দ বলেন, যারা এখনও ফিরতে পারেননি, তারা স্বপদে ফেরার চেষ্টা করছেন।
শাজাহানপুরের বেলঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওয়াদুদ হোসেন অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাঁকে মারধর করে বিদ্যালয় থেকে বের করে দেন। তাঁকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, এরপর বিদ্যালয়ে গেলে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। সম্প্রতি আবারও বিদ্যালয়ের বাইরে তাঁকে মারধর করা হয়েছে। পোয়ালগাছি উচ্চ বিদ্যালয়, মাঝিড়া উচ্চ বিদ্যালয়, সারিয়াকান্দির জোড়গাছা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ইয়াকুবিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
সিরাজগঞ্জে আদালতের নির্দেশের পরও বাধা
সিরাজগঞ্জে ডজনখানেক প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে রাজনৈতিক পরিচয়, পূর্বশত্রুতা বা নানা অভিযোগের জেরে অপসারণ, বরখাস্ত কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা হাজী ওয়াহেদ মরিয়ম ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লুৎফর রহমান প্রায় দুই বছর ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ।
লুৎফর রহমানের দাবি, হাইকোর্ট তাঁর স্বপদে ফেরার নির্দেশ এবং শিক্ষা বোর্ড বরখাস্ত আদেশ প্রত্যাহার করলেও পরিচালনা পর্ষদের কারণে যোগ দিতে পারছেন না। তবে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের মামলা রয়েছে। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যোগদান সম্ভব নয়।
সিরাজগঞ্জ পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ খাদিজা পারভীনও মবের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেছেন। একই ধরনের অভিযোগ তুলেছেন রেলওয়ে কলেজ উচ্চ বিদ্যালয়, সবুজ কানন স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান।
জেলায় জেলায় মব
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ৮ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান ৫ আগস্টের পর বাধার মুখে পড়েন বলে উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে। রাজাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুল ইসলামকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হলেও পরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তাঁকে পুনর্বহাল করা হয়। তবে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এখনও কর্মস্থলে যেতে পারছেন না।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয়দের চাপের মুখে পদত্যাগ করেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তারা হলেন– ভূলতা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল আউয়াল মোল্লা, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়-মিঠাবর প্রধান শিক্ষক মনি আক্তার মিলি, নব কিশলয় উচ্চ বিদ্যালয়ের নজিবুল ইসলাম, জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের মোক্তার হোসেন এবং প্রগতি উচ্চ বিদ্যালয়ের মোহাম্মদ আব্দুল করিম মিয়া। তাদের কেউই আগের পদে ফেরেননি। তবে নজিবুল ইসলাম ইতোমধ্যে অবসরে গেছেন।
আড়াইহাজারে তিন শিক্ষক মবের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে গোপালদী নজরুল ইসলাম বাবু কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর হাসান স্বপদে ফিরেছেন। তবে পাঁচরুখী বেগম আনোয়ারা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জাকির হোসেন ও চৈতনকান্দা গোলাম মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম এখনও কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি।
নওগাঁর রাণীনগরে দুই প্রধান শিক্ষক মবের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। তাদের একজন মোজাহার হোসেন আদালত ও প্রশাসনিক উদ্যোগে স্বপদে ফিরেছেন। অন্যজন শিয়ালা উচ্চ বিদ্যালয়ের হরেন্দ্রনাথ সরকার এখনও অপেক্ষায়। তাঁর দাবি, দেড় বছরের বেতন আটকে আছে এবং অবসরের আগে অন্তত ১১ মাস সম্মানের সঙ্গে চাকরি করতে চান।
নাটোরে চার প্রতিষ্ঠানপ্রধানের কর্মস্থলে যেতে না পারার অভিযোগ রয়েছে। ঠাকুরগাঁও পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ভবেশ চন্দ্র রায় এখনও কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। কিশোরগঞ্জে অন্তত ১২ শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল বলে জেলা শিক্ষা কার্যালয়ের গবেষণা কর্মকর্তা নাদিরুজ্জামান জানিয়েছেন। তাদের অধিকাংশই পরে কাজে ফিরেছেন।
মৌলভীবাজারে চার প্রতিষ্ঠানপ্রধানের চাপের মুখে দায়িত্ব হারানোর অভিযোগ রয়েছে। তাদের একজন আব্দুল কাদির হাইকোর্টে রায় পেয়েও দায়িত্বে ফিরতে পারেননি বলে দাবি করেছেন।
- বিষয় :
- মব জাস্টিস
- মব
- মব সহিংসতা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান