বিশ্ব ফুসফুস দিবস কাল
তরুণদের ফুসফুসে বাড়ছে তামাক-নিকোটিনের ঝুঁকি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:১০
ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগে বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ আক্রান্ত ও মারা যাচ্ছেন। ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ব্যবহার ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আগামীকাল শুক্রবার বিশ্ব ফুসফুস দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘এ লাইফটাইম অব লাং হেলথ’। ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শ্বাসতন্ত্রের রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩’ প্রতিবেদনে দেশের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের অবস্থানও উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি বিবিএসের প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানের অংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, তামাকের ব্যবহার ফুসফুসের ক্যানসার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসা বা পরোক্ষ ধূমপানও ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের ব্যাপকতাও উদ্বেগের। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের তামাক ব্যবহার করতেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে একই বয়সী জনগোষ্ঠীর বয়স-সমন্বিত তামাক ব্যবহারের হার ছিল ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যবহারকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের সদস্য, কর্মক্ষেত্র কিংবা জনসমাগমস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হওয়া মানুষেরও নানা ধরনের শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নতুন নিকোটিন পণ্যে উদ্বেগ
তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের ব্যবহার নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়ছে। এসব পণ্যের আকর্ষণীয় নকশা, বিভিন্ন স্বাদের ব্যবহার এবং ডিজিটাল মাধ্যমে প্রচার তরুণদের কাছে এগুলোকে আকর্ষণীয় করে তুলছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইন ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-এর নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ‘ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রচলিত তামাকপণ্যসহ ই-সিগারেট, ভেপিং এবং অন্যান্য নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার ও বিস্তার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি থেকে দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি তামাকজাত পণ্যের প্রচার, বিপণন ও সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধে জোর
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুসফুসের সুস্থতা রক্ষায় শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। তামাক ও নিকোটিন পণ্য থেকে বিরত থাকা, পরোক্ষ ধূমপান থেকে নিজেকে ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষিত রাখা এবং বায়ুদূষণ কমানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকের ব্যথা বা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব ফুসফুস দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তাও হলো ফুসফুসের যত্ন শুধু নির্দিষ্ট বয়সে নয়, সারা জীবন ধরে নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোর থেকেই তামাক ও নিকোটিনমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।