ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুজনের মূল্যায়ন

ঢাকা সিটি নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণের ধরন ছিল ভিন্ন

ঢাকা সিটি নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণের ধরন ছিল ভিন্ন
×

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ০৮:৪৯

ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন মূল্যায়ন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলেছে, দুই সিটির নির্বাচন সামগ্রিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল। তবে অতীতের তুলনায় নিয়ন্ত্রণের ধরন ছিল কিছুটা ভিন্ন। এই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনগুলো যেন দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। আর ইভিএম সম্পর্কে ভোটারদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা ছিল, এই নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি; বরং সেগুলো আরও প্রকট হয়েছে। এই উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে।

গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিজয়ীদের তথ্য বিশ্নেষণ ও নির্বাচন নিয়েসোমবার নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরে সুজন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার এ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি প্রচার আছে যে এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। সুজন মনে করে, এই শান্তি অশান্তির চেয়েও ভয়াবহ। কেননা, ভয়ের সংস্কৃতির কারণে কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস না পেলে সেই অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়া দুস্কর।

সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, নির্বাচন কমিশন যে ব্যর্থ, তা সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণ হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছারও অভাব রয়েছে। ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অনেক কমেছে, যা একটি অশনিসংকেত।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ঢাকা সিটি নির্বাচন ছিল নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। তারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। জাতীয় নির্বাচনে দৃশ্যমান কারচুপি হয়েছিল। এবার অদৃশ্য কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। যে অভিযোগগুলো এসেছে, সেগুলোর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। জাতীয় নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতিকে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে কারচুপির তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল সুজন, এবারও তারা সেই দাবি জানাচ্ছে। কারণ, নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোটা ভেঙে পড়লে আমরা খাদে পড়ে যাব।

বদিউল আলম বলেন, ব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বেশি সম্পদশালীরা বেশি নির্বাচিত হচ্ছেন। রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ আর ব্যবসার রাজনীতিকীকরণ চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সামনেও আর কোনো আশার আলো দেখছি না। তথাকথিত নির্বাচিতদের মধ্যে জবাবদিহি থাকবে না বলে আশঙ্কা করছি। ভোটের মাধ্যমে জনগণকে অপমান করা হচ্ছে। এটাকে আর বেশিদিন মানা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে পরাজয় মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। না হলে ভালো নির্বাচন সম্ভব নয়।

সুজন তাদের প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটার কম হওয়ার কিছু কারণ তুলে ধরে। সেগুলোর মধ্যে আছে- ভোট সুষ্ঠু হবে না ভোটারদের এমন পূর্বধারণা; ইভিএমের ওপর আস্থা না থাকা; দলগুলোর হুমকির কারণে ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ হওয়া; ভোটকেন্দ্রের বাইরে সরকারদলীয় কর্মীদের জটলা ও মহড়া; আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে কিছু কিছু ভোটারের ভোট না দিয়েই ফিরে যাওয়া; একজনের ভোট আরেকজনের দিয়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রচার হওয়া; যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকা, একসঙ্গে দু'দিন ছুটি থাকা ইত্যাদি। এর বাইরে নির্বাচনের মাঠে বিএনপির অনুপস্থিতি ও সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সুজন।

সংগঠনটি বলেছে, নির্বাচনই ক্ষমতা বদলের একমাত্র বৈধ এবং শান্তিপূর্ণ পথ। যদি ক্ষমতা হস্তান্তরের শান্তিপূর্ণ পথটি রুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে আমরা এক অশুভ ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হতে পারি, যার দায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে এবং মাশুল গুনতে হবে দল-মত নির্বিশেষে সকলকে।

সুজনের বিশ্নেষণে বলা হয়েছে, দুই সিটি নির্বাচনে উচ্চশিক্ষিত প্রার্থীরা তুলনামূলক বেশি নির্বাচিত হয়েছেন। উত্তরে ব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধির সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়লেও দক্ষিণে সেটা কমেছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর মিলিয়ে বিজয়ী প্রার্থীদের ৩৪ দশমিক ২৪ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক বা স্নাতকোত্তর। ২০১৫ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এ বছর নির্বাচিতদের ৫৮ দশমিক ৯০ শতাংশ স্বল্প শিক্ষিত, অর্থাৎ এসএসসি বা তার নিচে। ২০১৫ সালে স্বল্প শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন ৭০ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

দক্ষিণ সিটিতে নির্বাচিত ব্যক্তিদের ৬০ দশমিক ৪০ শতাংশ স্বল্প শিক্ষিত। ২০১৫ সালে স্বল্প শিক্ষিত বিজয়ী প্রার্থী ছিলেন ৫১ দশমিক ৩২ শতাংশ। এবার দক্ষিণে বিজয়ীদের ২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। ২০১৫ সালে এ হার ছিল ২১ দশমিক ১০ শতাংশ।

ঢাকা উত্তরে নির্বাচিত ৭৩ জনপ্রতিনিধির ৮৬ দশমিক ৩০ শতাংশ বা ৬৩ জন ব্যবসায়ী। ২০১৫ সালে ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছিলেন ৬৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণে নির্বাচিত ১০১ জনপ্রতিনিধির ৭৬ জন বা ৭৫ দশমিক ২৫ শতাংশ ব্যবসায়ী। ২০১৫ সালে দক্ষিণে ব্যবসায়ী জনপ্রতিনিধি ছিলেন ৮০ দশমিক ২৬ শতাংশ।

সংবাদ সম্মেলনে সুজনের কোষাধ্যক্ষ আবু নাসের মোহাম্মদ বখতিয়ার, নির্বাহী সদস্য ড. শাহনাজ হুদা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন

×