'হান্দেশ' ও 'নুনগড়া'র স্বাদে ঈদ আনন্দ
চয়ন চৌধুরী, সিলেট ব্যুরো
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০১৪ | ১১:৫৬ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০১৪ | ১১:৫৮
ঈদের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। যথারীতি সাজনা বেগমও কেনাকাটা করছেন সবার জন্য। এর ফাঁকে চালের গুঁড়া আনিয়ে রেখেছেন তিনি। ঈদে অতিথি আপ্যায়নে চালের গুঁড়া তার অন্যতম ভরসা বলে জানালেন তিনি। নগরীর আগপাড়ার বাসিন্দা সাজনা বেগম বললেন, ঈদের নামাজ শেষে ফেরার পর এই চালের গুঁড়ার তৈরি 'হান্দেশ' (তেলের পিঠা) বাসার সবার চাই-ই চাই। আত্মীয়স্বজনদের আপ্যায়নেও এই পিঠা থাকতেই হবে। জেল রোডের আরেক গৃহিণী সুলতানা নাজমিন বলেন, আমাদের বাসায়ও ঈদের দিন হান্দেশ থাকবেই।
সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ উপজেলার তার বাবার বাড়িতেও এই পিঠার প্রচলন রয়েছে বলে জানালেন তিনি। 'নুনগড়া' নামের আরেকটি পিঠার কথা বললেন নগরীর বড়বাজারের লিপি বেগম। তিনি বলেন, ঈদের দিনে মিষ্টি হান্দেশের পাশাপাশি নুনগড়ারও কদর রয়েছে। লবণাক্ত স্বাদের এই পিঠাও যথারীতি চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয়।
সিলেট অঞ্চলের ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হান্দেশ আর নুনগড়া। কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভেন্দু ইমাম বলেন, সর্বজনীন ঈদে অঞ্চলভেদে খাবার ও উৎসবের আনন্দে কিছুটা ভিন্নতা থাকে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটে ঈদ মানেই হান্দেশ ও নুনগড়ার কদর। সেই আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখনও মা-খালাদের এই পিঠা বানাতে দেখেছি। বর্তমান আধুনিক সমাজেও এ অঞ্চলের মানুষ নানা পদের খাবারের পাশাপাশি হান্দেশ ও নুনগড়ার কথা ভোলেননি। ঈদুল ফিতরে সেমাইয়ের চেয়েও সিলেট অঞ্চলে নানা পদের পিঠার প্রচলন আগে থেকেই চলে আসছে বলে জানালেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি অধ্যাপক আবদুল আজিজ।
তিনি বলেন, ঈদের দিনে নির্ধারিত কিছু খাবারের পাশাপাশি প্রায় প্রত্যেক অঞ্চলেই বিশেষ ধরনের খাবার দেখা যায়। সিলেট অঞ্চলে হান্দেশ, নুনগড়া, নারকেলের পবের মতো পিঠার কদর রয়েছে। আবদুল আজিজ বলেন, ইতিহাস-ঐতিহ্যে সিলেটে ঈদ উদযাপনে কিছুটা স্বাতন্ত্র্য রয়েছে।
এই স্বাতন্ত্র্যের ব্যাখ্যা করে মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ বলেন, প্রচার মাধ্যমের সুযোগ-সুবিধা বাড়ার ফলে এখন ঈদে সৌহার্দ্য অনেকখানি কমেছে। আগে নগরীর পাড়ায় পাড়ায় ঈদের দিনে প্রীতি ফুটবল খেলা হতো। গ্রামে-গঞ্জে হতো ষাঁড়ের লড়াই, মোরগ লড়াই। বর্ষাকালে ঈদ হলে নৌকাবাইচেরও আয়োজন হতো। সেগুলোর কিছু কিছু এখনও টিকে আছে।
অনেক জায়গায় ঈদের দিন কিংবা পরের দিনে হা-ডু-ডু ও লাঠি খেলার আয়োজন করা হতো বলে জানালেন আবুল ফতেহ ফাত্তাহ। তিনি বলেন, শীতকালে ঈদে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন রয়েছে। নাগরিক জীবনে ইদানীং ফুটবলের বদলে ক্রিকেট খেলা হয়ে থাকে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণেই হয়তো এখনকার ছেলেমেয়েরা অনেকখানি ঘরকুনো বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের শৈশব-কৈশোরে নানা খেলায় অংশ নিতাম। ঈদের নামাজ শেষে বাড়িতে খাবার খেয়েই আমরা খেলায় মত্ত হয়ে যেতাম।
এখন টেলিভিশন-ইন্টারনেটের যুগে তরুণ প্রজন্ম এসব খেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় সামাজিক ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে বলে অনুযোগ করেছেন অনেকে। তার পরও অধিকাংশ পরিবার এ অঞ্চলের ঈদের স্বাতন্ত্র্য আয়োজনের ধারা ধরে রেখেছে বলে জানান তারা। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোকাদ্দেস বাবুল বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাস-ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদেরই ভূমিকা রাখতে হবে। নইলে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে হারিয়ে যাবে আমাদের অতীত স্বাতন্ত্র্য।