ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কাটছে আঁধার ফুটছে আলো

জাতির জনকের প্রত্যাশার বাংলাদেশ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

কাটছে আঁধার ফুটছে আলো
×

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০১৫ | ১৩:৩৮

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুধু একজন ব্যক্তিই নয়, একটি জাতির স্বপ্নকেই হত্যা করতে চেয়েছিল ঘাতকরা। তারা বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছিল ঘোর অন্ধকারে। সেই অমানিশা ধীরে ধীরে দূর হচ্ছে, আবার ফুটে উঠছে আলোর রেখা। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন জাতির জনক। তার প্রত্যাশা পূরণই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা এখনও সম্পূর্ণ দূর হয়নি। সেই অন্ধকার এখন ধীরে ধীরে কাটছে। ফুটে উঠছে আলোর রেখা। রাজনীতিতে অর্থ এবং পেশির দাপট, ছাত্র রাজনীতিতে মূল্যবোধের অভাব, স্বাধীনতার বিপক্ষের সাম্প্রদায়িক শক্তির নানামুখী ষড়যন্ত্র এখনও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হলে ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সবার জন্য সমান সুযোগ সংবলিত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, তাহলেই দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সফল হবে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোকাবহ ১৫ আগস্ট সামনে রেখে সমকাল আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনায় এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজন।


গত বৃহস্পতিবার সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের সঞ্চালনায় 'জাতির জনকের প্রত্যাশার বাংলাদেশ :আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে' শিরোনামে আয়োজিত এই বিশেষ আলোচনায় মূল আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত এ আলোচনায় আরও অংশ নেন সমকালের নির্বাহী সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি, সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত, বার্তা সম্পাদক সবুজ ইউনুস, নগর সম্পাদক শাহেদ চৌধুরী, প্রধান প্রতিবেদক লোটন একরাম এবং বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী। উপস্থিত ছিলেন সমকালের ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক তপন দাশ, সহকারী সম্পাদক সুমন্ত আসলাম, শেখ রোকন প্রমুখ।


অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল 'দুঃখী মানুষ'। পাকিস্তান আমলে তিনি কিছু মানুষের সকল সুবিধা ভোগ করা এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর কষ্টকর জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি পুরো দেশ ঘুরেছেন, মানুষের কাছে গিয়ে দুঃখী মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মর্মবেদনা উপলব্ধি করেছেন। এ কারণে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্রত হয়ে উঠেছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আর এটাই ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামেরও প্রেরণা।


তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েও বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষকেই তার রাজনৈতিক কর্মসূচিতে প্রাধান্য দিয়েছেন। ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়েছেন। এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হচ্ছে ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং প্রথম পাঁচশালা পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি জাতির স্বপ্নকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের সমাজ প্রতিষ্ঠার সেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকেই হত্যার চেষ্টা হয়েছে।


রেহমান সোবহান বলেন, এখন দেশের অগ্রগতি হচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে, 'দেশে কি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? বঙ্গবন্ধুর সেই দুঃখী মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন হয়েছে? নাকি কিছু লোক সরকারি সুযোগ-সুবিধায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে? এই মহলই কি শক্তিশালী হয়েছে এবং রাজনীতি সাধারণ মানুষ থেকে দূরে সরে গেছে?'
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে যারা বেশিরভাগ সময় ক্ষমতায় ছিলেন তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করতেন না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ পেলে, ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে পারলে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে যারা বিশ্বাস করেন তারা ক্ষমতায় থাকলে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে।


ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে 'চাটার দল ও চাটুকাররা' বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রেখেছিলেন, তারা যেন শেখ হাসিনাকে কোনোভাবেই আবদ্ধ করে ফেলতে না পারেন। আমাদের লক্ষ্যও পরিষ্কার। প্রবৃদ্ধি হবে এবং তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তিও ঘটবে। দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।


দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে সরকারের পদক্ষেপের প্রশংসা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, একাত্তরে সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে সাড়ে ৫ কোটিই ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। এখন ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ৪ কোটি দারিদ্র্যসীমার নিচে। তখনকার গরিব মানুষের চেয়ে এখনকার গরিব মানুষের অবস্থা অনেক ভালো। ১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধরে ধরে ধাপে ধাপে দেশের অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। চীন, জাপান ও ভারতবর্ষের মতো অর্থনৈতিক শক্তিগুলোও এখন বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আমাদের আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে।


অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তার প্রত্যাশা পূরণের পথ থেকে আমাদের অনেক পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার হত্যার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও জীবন-জীবিকার পথই রুদ্ধ করা হয়েছে। তবে সেখান থেকে আজ উত্তরণ ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আজ সাধারণ মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণের লক্ষ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, তরুণ সমাজকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন উপলব্ধি করতে হবে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র_ এই চার মৌলিক বিষয়কে নিয়েই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।


বঙ্গবন্ধুর হত্যার নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারী, পরিকল্পনাকারীসহ জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে বিচার দাবি করে ঢাবি উপাচার্য বলেন, জাতি, রাষ্ট্র ও নিরাপত্তার স্বার্থেই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার আইনি বিচার হয়েছে। কিছু খুনির ফাঁসি হয়েছে, কিছু পালিয়ে গেছে। কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যচক্রে কে কোথায় ছিল_ তাদের সবার অবস্থান চিহ্নিত করে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনার জন্য কমিশন গঠন করতে হবে। তাহলেই নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে ১৫ আগস্টের আগে-পরের ষড়যন্ত্রে কে কোথায় ছিল।


অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, সব প্রতিকূলতা, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সবচেয়ে অনুকূল অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে, এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। জাতি বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসছে। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি সব ক্ষেত্রে চমকে যাওয়ার মতো অগ্রগতি হচ্ছে।
তিনি বলেন, এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি বিবর্তন ঘটেছে। আগে যেখানে উন্নত মনন ছিল এখন সেখানে অর্থনৈতিক সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছে। আগে তোফায়েল আহমেদের মতো ছাত্রনেতারা হেঁটে মধুর ক্যান্টিনে আসতেন। এখন ছাত্রনেতারা দামি গাড়ি থেকে নামেন, সঙ্গে তার সহকারী থাকে, হাতে চারটা দামি মোবাইল। জাতীয় রাজনীতিতে যেমন ব্যবসায়ী এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের দাপট, তেমনি ছাত্র রাজনীতিতেও যে কোনো মূল্যে অর্থ উপার্জনই লক্ষ্য হয়ে গেছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধু মানুষের জন্য ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তার সেই বোধই হবে জাতির এগিয়ে যাওয়ার মূল মন্ত্র। অর্থের প্রবাহে দিশেহারা রাজনীতি সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরেই। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সে পথেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, এটাই প্রত্যাশা।


সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বেশিরভাগ সময়ই যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও চেতনায় বিশ্বাস করে না_ তারাই দেশ শাসন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা খুব বেশি সময় দেশ শাসন করতে পারেনি। তারপরও আমরা জাতির জনকের প্রত্যাশার বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন রেখে গেছেন, তা বাস্তবায়নে দেশকে শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

আরও পড়ুন

×