যশোরের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি শতাধিক ডেঙ্গু রোগী
স্বাস্থ্য বিভাগে নেই কীটতত্ত্ববিদ, জরিপও হয় না
ছবি: সমকাল
যশোর অফিস
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:৩১
ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু বিস্তারের জেলার মধ্যে যশোর অন্যতম। এখানকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০১ জন ডেঙ্গু রোগী। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও শতাধিক। চলতি মৌসুমে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন, মারা গেছেন তিনজন। এখানে শহরের চেয়ে গ্রামেই রোগী বেশি। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী অভয়নগরে, সেখানে চলতি মৌসুমে ৫৭৩ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৮টার আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে অভয়নগরে ১০ জন, কেশবপুরে আটজন, বাঘারপাড়ায় ছয়জন, মনিরামপুরে চারজন, শার্শায় তিনজন ও ঝিকরগাছায় একজন রয়েছেন।
এদিকে উদ্বেগজনকভাবে সংক্রমণ বাড়লেও জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে নেই কোনো কীটতত্ত্ববিদ। প্রায় দুই বছর ধরে শূন্য রয়েছে পদটি। ফলে কোথায় এডিস মশার প্রজননস্থল, কোন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি কিংবা কীভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে, সেসব বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক জরিপ করতে পারছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এটি বড় দুর্বলতা। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো নিয়োগ হয়নি।
ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়ার প্রভাব পড়েছে হাসপাতালগুলোতে। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় রোগীদের পুরুষ ও নারী মেডিসিন ওয়ার্ডেও ভর্তি রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর জন্য ২০ শয্যার বিশেষ ওয়ার্ড চালু থাকলেও রোগী বেড়ে যাওয়ায় সেই সক্ষমতা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। বর্তমানে ডেঙ্গু ওয়ার্ড এবং পুরুষ-নারী মেডিসিন ওয়ার্ড মিলিয়ে ৫১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত বুধবার বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৪৩ জন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাই বেশি। প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি তাদের ডেঙ্গু পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োজিত রয়েছেন। ওষুধ ও স্যালাইনের সংকট নেই। তবে মানুষ সচেতন না হলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের মতে, চার কারণে যশোরে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। যশোর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র। রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রেন, বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক নিয়মিত এখানে আসে। এসব যানবাহনের মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তার ঘটার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ট্রাকের পেছনের অংশ, গ্যারেজ এলাকা ও পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এ ছাড়া ভারত ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যাতায়াতকারী মানুষের চাপও এখানে বেশি। উন্নত চিকিৎসাসেবা থাকায় আশপাশের জেলা থেকেও ডেঙ্গু রোগীরা যশোরে চিকিৎসা নিতে আসেন।
তাঁর মতে, অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টি সংক্রমণ বাড়াচ্ছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি জটিল হলেও জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব, লার্ভার বিস্তার কিংবা সংক্রমণের উৎস নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো জরিপ হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত্ববিদ আমিনুল হক বলেন, গ্রামাঞ্চলে এডিস অ্যালবোপিকটাস বেশি পাওয়া যায়। শহরে বেশি থাকে এডিস ইজিপটাই। ডেঙ্গু বিস্তারে দুটি প্রজাতিই দায়ী।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, প্রথম দিকে ঢাকা থেকে আসা রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল। পরে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকছে। এতে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে। অক্টোবরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে।