ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংকট সমাধানের সংকেত নাকি রাজনৈতিক কৌশল

সংকট সমাধানের সংকেত নাকি রাজনৈতিক কৌশল
×

মসিউর রহমান খান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৩ | ০৪:৩৯

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইঙ্গিত চলমান সংকট সমাধানের উপায়, নাকি রাজনৈতিক কৌশল, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। সরকারের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, সংবিধানের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ ছাড় দিতে চান। এ কারণেই তিনি সংসদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নির্বাচনকালীন সরকারে স্থান দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের নজির নেই। সুতরাং নির্বাচনকালীন সরকারকে হতে হবে নিরপেক্ষ।

এই অবস্থায় বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে একই ধরনের প্রস্তাব বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছিল। গত এক দশকে বড় এই দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি আগের মতোই রয়ে গেছে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের ভোট নিয়ে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে চলমান সংকটের সমাধানের উপায় খোঁজা দুরূহ বিষয়। তবে কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকারে এবার এমন সব দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে বিএনপি আরও চাপে পড়ে যায়।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, সংবিধানের মধ্যে থেকেই নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির প্রতিনিধি রাখার সুযোগ রয়েছে। সেজন্য বিএনপির আগ্রহ থাকতে হবে। দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের একজন সমকালকে জানান, মন্ত্রিসভা গঠন বা পুনর্গঠনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। বিএনপি আগ্রহ দেখালে টেকনোক্র্যাট কোটায় তাদের প্রতিনিধি মন্ত্রিসভায় থাকতে পারে। সংবিধান অনুযায়ী, প্রতি ১০ জন সদস্যের বিপরীতে একজন অনির্বাচিতকে মন্ত্রিসভার সদস্য করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা ২০ সদস্যের হলে বিএনপির দু’জন প্রতিনিধি নেওয়া সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী গত সোমবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা এইটুকু উদারতা দেখাতে পারি, পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য যাঁরা আছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছা পোষণ করে নির্বাচনকালীন সরকারে আসতে চান, আসতে পারেন। ২০১৪ সালে খালেদা জিয়াকেও আহ্বান করা হয়েছিল। তাঁরা আসেননি। এখন তো তাঁরা পার্লামেন্টে নেই। কাজেই ওটা নিয়ে চিন্তারও কিছু নেই।’

তবে আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, সংবিধানের মধ্যে থেকে বিএনপিকে নির্বাচনে আসার সুযোগ করে দিতে সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেক্ষেত্রে বিএনপিকে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না– এই মনোভাব ছাড়তে হবে। আর আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপির জন্য এই সুযোগ গ্রহণ করা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথও নেই।

বর্তমান সংসদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং মহাজোটের শরিকদের বেশির ভাগেরই প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। বিএনপির সাতজন সদস্য থাকলেও গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁরা পদত্যাগ করেন। সংসদে এখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে প্রতিনিধিত্ব রয়েছে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ, নজিবুল বশর মাইজভান্ডারীর নেতৃত্বাধীন তরীকত ফেডারেশন এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি-জেপি। এ ছাড়াও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি ও বিকল্পধারার প্রতিনিধিও রয়েছে সংসদে।

আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি দলের প্রতিনিধিকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে ১৪ দলের জোট শরিকদের এবার নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় নাও দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠনে ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে গঠিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামকে নিয়ে চিন্তা করা হচ্ছে। গণফোরামের মোকাব্বির খান এবং স্বতন্ত্র সদস্য উকিল আব্দুস সাত্তারকে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। উকিল আব্দুস সাত্তার বিএনপির এমপি হিসেবে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রতিনিধির নির্বাচনকালীন সরকারে থাকাটা নিশ্চিত। সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিকল্পধারা থেকেও প্রতিনিধি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন। এ বিষয়ে এখনও বিস্তারিত বলার সময় আসেনি। আরও কিছুদিন পরে হয়তো অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়ে যাবে। তিনি বলেন, টেকনোক্র্যাট কোটায় অনির্বাচিত সদস্য মন্ত্রিসভার রাখার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগ কীভাবে কাজে লাগানো যাবে, তা নিয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে জাতীয় পার্টিসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে নিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার বা দলীয় সরকার যেই ব্যবস্থাই থাকুক না কেন, সুষ্ঠু ভোট না হলে চলমান রাজনৈতিক সংকট কাটবে না। সংকট কাটানোর একমাত্র উপায় সুষ্ঠু নির্বাচন। তিনি বলেন, জাপা তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিশ্বাস করে না। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে সামর্থ্যবান হতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকারকেও আন্তরিক হতে হবে। ‘নির্বাচনকালীন সরকারে জাপা অংশ নিবে কিনা’ তিনি এই প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে একটি ফর্মুলার কথা বলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব জাতীয় পার্টির কাছে এলে তখন দলীয় ফোরামে আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গণফোরামের মোকাব্বির খান অবশ্য বলেছেন, প্রস্তাব পেলে তিনি নির্বাচনকালীন সরকারে যাবেন কিনা সেটি তাঁর দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তিনি দলের সিদ্ধান্তই মেনে নেবেন। তবে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হলেও চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান হবে বলে তিনি মনে করছেন না।
এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি গতকাল মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ তৈরির জন্য তাঁরা লড়াই সংগ্রাম করছেন। আর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলে সেটি হবে না। নির্বাচন হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। নির্বাচনকালীন সরকার আওয়ামী লীগ গঠন করবে কি করবে না, সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। বিএনপির কাছে সেটি কোনো ব্যাপারই না। বিএনপি নিরপেক্ষ সরকার চায়। সেই নিরপেক্ষ সরকার অবশ্যই নির্দলীয় হতে হবে। সেখানে দলীয় ব্যক্তিরা থাকতে পারবেন না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু নির্বাচনের ওয়াদা দিলেও ভোট নিয়ে কী ঘটনা ঘটেছে তা জাতি জানে। তাই মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া বিএনপির লক্ষ্য নয়। বিএনপি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ধারা ফিরিয়ে আনতে চায়। আর দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, সেটি আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে প্রমাণ করেছে। অতএব তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এটিই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বাস্তবতা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ এখনও একই জায়গায় রয়ে গেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপিসহ বিভিন্ন দল ২০১৪ সালে সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনে ছিল। তখন তাদের সহিংস আন্দোলনের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারে থেকেই একতরফা নির্বাচন করেছিল। ওই সময়েও সংবিধানের বাইরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকারের দাবি মানতে রাজি হয়নি আওয়ামী লীগ।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে সংবিধানের ভেতরে থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকারে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ জোটভুক্ত শরিক দলগুলো অনেককেই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনও হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে।

আরও পড়ুন

×