ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভুল চিকিৎসার অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা

ভুল চিকিৎসার অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা
×

ফাইল ছবি

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৩ | ১৮:০০

রাজধানীর আফতাবনগরের বাসিন্দা আজরিন আহমেদ ইসিকা। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর তিনি ডা. সংযুক্তা সাহার ফেসবুক প্রচারে আকৃষ্ট হয়ে ঢাকার সেন্ট্রাল হাসপাতালে তাঁর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। পরে গত ১ নভেম্বর স্বাভাবিক প্রসবের জন্য ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। সন্তান প্রসবে জটিলতা দেখা দিলেও সংযুক্তা সাহা জোর করে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন। এতে সন্তানের মাথা জরায়ুতে আটকে যায়। পরে মেশিনের সাহায্য সন্তান বের করা হলেও নবজাতক মাথা ও বুকে আঘাত পায়। পরে ওই হাসপাতালের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। আট দিনের মাথায় মারা যায় ওই শিশু। এমন অবহেলায় সেন্ট্রাল হাসপাতালে অভিযোগ করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। আইনি ঝামেলা এড়াতে পরিবারের চাপে ইসিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসিতে অভিযোগ করেননি।

গত ১৫ মে রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় এক রোগীর মৃত্যুতে দায়িত্বে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে অধ্যাপক ডা. গোলাম আজম, ডা. শেখর কুমার মণ্ডল ও ডা. রাশেদুল হাসান কনকের শাস্তির দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসিতে অভিযোগ দিলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

দেশে প্রায়ই চিকিৎসকের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসা নিয়ে রোগীর আত্মীয়দের সঙ্গে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের বাদানুবাদ ও ভাঙচুরের খবর শোনা যায়। প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিএমডিসিতে করা হলেও প্রতিকার মিলছে না। এখনও বিএমডিসিতে নিষ্পত্তিহীন ৮৮ শতাংশ অভিযোগ পড়ে আছে। এমনকি এসব অভিযোগের বড় একটি অংশের প্রমাণ মিলছে না তদন্তে।

বিএমডিসির তথ্য বলছে, গত ১৩ বছরে ২৬৮টি লিখিত অভিযোগ এসেছে সংস্থাটিতে। এর মধ্যে ৩৪ ঘটনার নিষ্পত্তি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ৫০ চিকিৎসকের রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট যাচাই চলছে, আর ২৮ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সম্প্রতি অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে দুই চিকিৎসককে চিঠি দিলেও উত্তর মেলেনি। অভিযোগের প্রমাণ মিললেও শাস্তি হচ্ছে হাতেগোনা। গত ১৩ বছরে একজন চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল ও ১২ জনের বিভিন্ন মেয়াদে নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিনিয়ত অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, আইনের কিছু ত্রুটিকে দুষছেন তাঁরা। প্রতিনিয়ত ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ উঠলেও প্রতিকার মিলছে কম। এ জন্য রোগী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন জরুরি।

দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইন জরুরি। যে কোনো অপরাধের শাস্তি পর্যাপ্ত না হলে, সেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির বিধান রাখা উচিত।

২০১৬ সালের ‘রোগী চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন’ তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার। চিকিৎসকের বাধার মুখে এরই মধ্যে চারবার এই আইন সংশোধন হয়েছে। তবে চিকিৎসকদের প্রবল আপত্তি থাকায় এটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিতে আইন হচ্ছে। সেখানে জেল-জরিমানার বিধানও থাকছে। আইনটি বাস্তবায়ন হলে কমে আসবে এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি।

বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন সমকালকে বলেন, রোগীকে আকৃষ্ট করতে ফেইসবুকে প্রচার চালানো অনৈতিক। চিকিৎসকদের আচরণ এবং নীতিমালার বিষয়টি আছে, সেটার মোডিফিকেশন সম্ভব যদি হয়, নতুন আইনে যুক্ত করব। অভিযোগের নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা বিষয়ে তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ অনেক আসে। একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তদন্তে সময় লাগে। তবে প্রতিটি অভিযোগেরই গুরুত্ব দেয় বিএমডিসি। অভিযোগ আসার পরই বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার বিষয়টি পুরোপুরি পরিষ্কার প্রমাণ করা কঠিন। এ ছাড়া চিকিৎসকদের নানা সংগঠন শক্তিশালী হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। একজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আরেকজন সাক্ষ্য দিতে চান না। এখানেই বিপত্তি বাধে। এমন হাজারো মামলা চিকিৎসকের সাক্ষ্য গ্রহণের অভাবে ঝুলে আছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, চিকিৎসকের অদক্ষতা, ভুল বা অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় এর বিচার সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। অন্যদিকে ডাক্তারও পার পেয়ে যাচ্ছেন।


আরও পড়ুন

×