দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে ভুগছে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো। বর্তমানে খাদ্য অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে প্রায় সাত হাজার পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে খাদ্য অধিদপ্তরের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ৯০ ভাগের বেশি পদ শূন্য আছে। এতে খাদ্য বিতরণ, সংগ্রহ, মনিটরিংসহ সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাবে লাগামহীনভাবে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। একই সঙ্গে ভেজালবিরোধী অভিযান বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চাল সুষ্ঠুভাবে বিতরণ ও মনিটরিং করতে না পেরে বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে বৈশ্বিক মহামারি করোনাকালীন এই দুর্যোগে খাদ্য সরবরাহ ও মনিটরিং নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদপ্তরের অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ১৩ হাজার ৬৭৬। এর মধ্যে কর্মরত আছেন প্রায় আট হাজার। প্রায় ছয় হাজার জনবলের পদ শূন্য। প্রথম শ্রেণির ক্যাডার পদ ৮৯৩টি ও নন-ক্যাডার পদ ৬৫৭টি। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির এক হাজার ৭৫৭টি, তৃতীয় শ্রেণির পাঁচ হাজার ৪১৬ ও চতুর্থ শ্রেণির পাঁচ হাজার ৬১০টি। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত পদ ৩৬৫টি। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ১০২টি পদের মধ্যে সব পদই শূন্য। দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো পদ নেই। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির বাকি পদগুলো প্রায় সবই শূন্য। খাদ্য কর্তৃপক্ষের নামে মাত্র কয়েকজন কর্মকর্তা ডেপুটেশনে কাজ করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সমকালকে বলেন, জনবল সংকট দূর করার জন্য গত ২০ মার্চ নিয়োগ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল। করোনাভাইরাসের কারণে এই পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি ভালো হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নিয়োগ দিতে হয়। এজন্য তাড়াহুড়া করা যায় না। তিনি বলেন, ধান, চাল ও গম সংগ্রহে কর্মচারী পর্যায়ের লোক বেশি প্রয়োজন। বর্তমান জনবল নিয়ে কীভাবে এই কাজ দ্রুত সময়ে ভালোভাবে করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করছি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, খাদ্য অধিদপ্তরকে সবসময় অপারেশন ও মনিটরিংয়ের কাজ করতে হয়। কাজগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুর্যোগের সময়ে জনবল সংকটের কারণে অনেক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ত্রাণ ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল সরবরাহ ও মনিটরিংসহ অনেক কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। খাদ্যগুদামে খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রি ইতোমধ্যে স্থগিত করা হয়েছে। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ এই চাল কিনতে না পেরে চরম কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছে। কর্মকর্তারা জানান, খাদ্য অধিদপ্তরে এমনিতেই জনবল সংকট। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় অনেক পদও রয়েছে। সারাদেশে অস্থায়ী ক্রয়কেন্দ্রে বেশকিছু জনবল রয়েছে, যেগুলো কোনো কাজে আসে না। তবে এসব পদ বিলুপ্ত করে নতুন পদ সৃজনের কাজ চলছে। কিন্তু খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়া যে গতিতে চলছে, এতে এ কাজ শেষ করতে অনেক সময় লেগে যাবে। একইভাবে জনবল সংকটের কারণে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্যোগের এই সময়ে তাদের প্রায় সব কাজ বন্ধ রয়েছে। অথচ সবচেয়ে কঠিন দুর্যোগে যখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রতিনিয়ত দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও ভেজাল খাদ্যের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে হাজার হাজার মামলা করছে, তখন নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন জনবল সংকটের কারণে তাদের বাজার মনিটরিং ও ভেজালবিরোধী কার্যক্রম প্রায় বন্ধই রেখেছে।

ঢাকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশরাফুল আলম সমকালকে বলেন, অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের মতো ঢাকা জেলাতেও অনেক জলবল ঘাটতি রয়েছে। জনবল কম থাকায় অনেক কাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে দুর্যোগের এই সময়ে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কিছু লোক নিয়োগ দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও ভেজালবিরোধী অভিযানে তেমন কোনো সফলতা আসেনি। জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হেলাফেলার সুযোগ নেই। তাই খাদ্য অধিদপ্তর ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য সংস্থার শূন্য পদে নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা একেবারেই কাম্য নয়।

খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারোয়ার মাহমুদ সমকালকে বলেন, তবে পরিস্থিতি ভালো হলে শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা হবে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহাবুব কবীর সমকালকে বলেন, প্রথম শ্রেণির ১০২টি ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির ৮৫টি পদে নিয়োগের কাজ চলমান। প্রথম শ্রেণির পদগুলোর পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ হলেই নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে সবকিছুই স্থগিত রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনবল ছাড়াও খাদ্য অধিদপ্তরের অনেক দুর্বলতা রয়েছে। ফলে অনুমোদিত পদের অনেক পদ শূন্য রয়েছে। বর্তমানে যারা কর্মরত, তাদের শতভাগ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে; যেন তারা দ্বিগুণ কাজ করেন। তিনি বলেন, দুর্যোগ আসার পর সচেতন হয়ে লাভ নেই। এজন্য পূর্বপ্রস্তুতি রাখা প্রয়োজন।