চট্টগ্রামের অনেক মাদ্রাসায় একসময় জাতীয় সংগীত গাওয়া হতো না। সেসব মাদ্রাসায় গিয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ানো, 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগান দেওয়া এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা ছিল অসম্ভব একটি কাজ। সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন আইনজীবী জিনাত সোহানা চৌধুরী। গত তিন বছর ধরে সুচিন্তা বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের ব্যানারে তিনি চট্টগ্রামের প্রায় ১২০টি মাদ্রাসায় 'জঙ্গিবাদবিরোধী আলেম-ওলামা ও শিক্ষার্থী সমাবেশ' করেছেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন। জিনাতের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে হাজার শিক্ষার্থী গেয়েছেন জাতীয় সংগীত, স্লোগান দিয়েছেন 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু'।
করোনা-দুর্যোগেও মাঠে রয়েছেন সেই জিনাত সোহানা চৌধুরী। মায়ের মমতা নিয়ে অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কোনো রোগী পাড়া-প্রতিবেশীর মাধ্যমে বিরূপ আচরণের শিকার হচ্ছেন শুনলেই তিনি ছুটে যান সেখানে। প্রয়োজনে প্রশাসনের সহায়তায় রোগীর বাড়িতে অবস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে উদ্যোগ নিয়েছেন। গত তিন মাসে করোনা আক্রান্ত সহস্রাধিক মানুষের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন খাবার।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক ও সুচিন্তা বাংলদেশ ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় সমন্বয়ক জিনাত সোহানা চৌধুরী চট্টগ্রাম করোনা আইসোলেশন সেন্টারের অন্যতম উদ্যোক্তা ও মুখপাত্র। এই সেন্টারে এ পর্যন্ত ২৪০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, তার মধ্যে ২০০ জনই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। জিনাত সোহানা প্রতিদিন করোনা আইসোলেশন সেন্টারে উপস্থিত থেকে সহকর্মীদের সঙ্গে করোনাযুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। হাসপাতালের জন্য তহবিল জোগাড়, মূল্যবান যন্ত্রপাতি যেমন সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম চালু, এক্সরে মেশিন সংগ্রহের পাশাপাশি করোনা রোগীর সেবা করছেন। সম্প্রতি জিনাত সোহানা করোনায় মৃত পাঁচ শতাধিক লাশ দাফন করে আলোচিত মানবিক সংগঠন গাউছিয়া কমিটিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্লোরিডার কাছ থেকে অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ করে দিয়েছেন।
বরেণ্য সমাজবিজ্ঞনী ও চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অনুপম সেন বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দিতে এবং জঙ্গিবাদবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে জিনাত সোহানা চৌধুরী যে কাজ করছেন, তা তুলনাহীন। বর্তমানে করোনা-দুর্যোগেও তিনি নানা প্রচেষ্টার মাধ্যমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এটা সমাজের জন্য সুন্দর উদাহরণ হয়ে থাকবে।
করোনা আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসা নেওয়া ষোলশহর ওয়ার্ড বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক এম এ হামিদ দিদার ও তার স্ত্রী লেখক মর্জিনা হক বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়েছেন জিনাত সোহানা। তাদের করোনা পরীক্ষা থেকে শুরু করে ইনজেকশনটিও ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে কিনা, সে ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন জিনাত। মর্জিনা বলেন, একজন নারী প্রতিদিন হাসপাতালে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন, এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশের যুগ্ম মহসাচিব মোসাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বলেন, আমাদের সংগঠন এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এবং উপসর্গে মৃত ৫২০ লাশ দাফন করেছে। শুরুর দিকে বৃষ্টিবাদলে লাশ বহনে ভীষণ কষ্ট হতো স্বেচ্ছাসেবীদের। গত ২৯ জুন জিনাত সোহানার একান্ত প্রচেষ্টায় নতুন অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেছে। এ জন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ।
জিনাত সোহানা চৌধুরী বলেন, করোনার শুরু থেকে মাঠে আছি। রোগীরা যখন একের পর এক হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছিলেন, তখন আমরা হালিশহরে আইসোলেশন সেন্টার গড়ে তুলেছি। দুর্যোগে অসহায় রোগীদের সেবা করতে পারছি ভেবে ভালো লাগছে। তিনি বলেন, দেশের এই দুঃসময়ে তো নিজেদের কথা ভেবে ঘরে বসে থাকা যাবে না।