বিদ্যুৎহীন দিনরাত্রি, মহাভোগান্তি
জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ে অন্ধকারে ডুবে ছিল রাজধানী। মঙ্গলবার তেজগাঁও এলাকা থেকে তোলা সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২২ | ২০:১৮
জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীসহ দেশের এক বড় অংশ দীর্ঘ সময় ছিল বিদ্যুৎহীন। ফলে দিনরাত্রি মহাভোগান্তিতে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। বাধাগ্রস্ত হয় চিকিৎসাসেবা। কোথাও কোথাও রোগীর চিকিৎসা চলে মোমের আলোয়। ইন্টারনেট ও ফোনসেবা হয় বিঘ্নিত। দুর্গাপূজা উৎসবেও পড়ে ভাটা। পাম্পগুলোতে তেল ও সিএনজি বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়। এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতেও বেকায়দায় পড়েন গ্রাহকরা। প্রচণ্ড গরমে বাসাবাড়িতে অস্বস্তিতে পড়েন বৃদ্ধ ও শিশুরা। রাতেও সড়ক-অলিগলি ডুবে থাকে অন্ধকারে। মোমবাতি জ্বালিয়ে চলে বেচাকেনা। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের। দেখা দেয় মোমবাতি সংকট। রাত ১টার দিকে এ প্রতিবেদন লেখার সময় কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
ঘটনা তদন্তে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) নির্বাহী পরিচালক (পিঅ্যান্ডডি) ইয়াকুব ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের আরও দুটি কমিটি করার কথা রয়েছে।
গ্রিড বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে গতকাল রাত পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে পারেনি সংশ্নিষ্ট কোনো সংস্থা। পিজিসিবির কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা আপাতত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দিকে নজর দিয়েছেন। পরে কারণ খুঁজে বের করবেন। তবে বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, নরসিংদীর ঘোড়াশালে দুটি উপকেন্দ্রে সংযোগ দেওয়ার সময় আশুগঞ্জ গ্রিডে বিপর্যয় দেখা দেয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডের পূর্বাঞ্চলীয় জোনে গতকাল দুপুর ২টা ৪ মিনিটে বিপর্যয় শুরু হয়। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লার আংশিক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। তবে খুলনা, বরিশাল ও যমুনা নদীর ওপারে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ সংকট হয়নি। গতকাল বিকেলে আশুগঞ্জ-সিরাজগঞ্জ লাইন চালুর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয় বিকেল সোয়া ৫টায়। রাত ১১টার মধ্যে টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, জামালপুর, চট্টগ্রাম ও মানিকগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। তবে গাজীপুর, ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের কিছু এলাকা তখনও ছিল বিদ্যুৎহীন।
রাত ৯টায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াটে, যা চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ। ঢাকায় রাত ৯টায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়।
এ ব্যাপারে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, প্রকৌশলীরা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে বিদ্যুৎ বিভাগকে নিজেদের পাশাপাশি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। তিনি গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের গ্রিড বিপর্যয়ের তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে এ ধরনের ঘটনা কম হতো।
এদিকে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে পুলিশকে বিশেষ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয় কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে হাইওয়ে, পূজামণ্ডপগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নিতে বলা হয়।
হাসপাতালে সেবা বিঘ্নিত :বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের বিভিন্ন স্থানে রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে বিপদে পড়েন চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বিঘ্ন ঘটে সিটিস্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। বিশেষ ব্যবস্থায় চলে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ও আইসিইউ। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খায়। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর নেই। সেখানে ভোগান্তি ছিল বেশি। সিলেটের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে সন্ধ্যার দিকে পানি সংকট দেখা দেয়। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে আলো জ্বললেও বিভিন্ন ওয়ার্ড ছিল অন্ধকারে। ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাইন উদ্দিন খান মানিক বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় নেবুলাইজার মেশিন চালানো যায়নি। ফলে শ্বাসকষ্টের রোগীদের দীর্ঘ সময় অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শারমিন আক্তার বলেন, মোমবাতি ও মোবাইল ফোনের আলোতে সেবা দিতে হচ্ছে। নোয়াখালীতেও চিকিৎসাসেবা বিঘ্নিত হয়।
পূজার উৎসবে ভাটা: বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্গাপূজার নবমীর আনন্দ-উৎসবে ভাটা পড়ে। মণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। ঢাকার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, কোথাও কোথাও জেনারেটর দিয়ে উৎসবস্থল আলোকিত করা হয়। তবে গরমে অতিষ্ঠ হতে হয় পূজা দেখতে আসা ভক্তদের। সুনামগঞ্জের বাঁধনপাড়া পূজামণ্ডপের পূজারি প্লাবন দে বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দর্শনার্থীদের পানি সংকটে পড়তে হয়।
মোমের আলোতে বিচারকাজ: বিদ্যুৎ-ভোগান্তির কবলে পড়েন সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট। বিদ্যুৎ না থাকায় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের এজলাসে মোমবাতি জ্বালিয়ে ও মোবাইল ফোনের আলোতে বিচারকাজ পরিচালনা করেন বিচারপতিরা। সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দু'জন বিচারপতি মোমবাতি ও মোবাইল ফোনের আলোয় দীর্ঘ সময় বিচারকাজ পরিচালনা করেছেন।
বাড়ি বাড়ি সংকট: রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর অনেক ভবনে জেনারেটর চললেও একটা সময় পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক বাসায় আইপিএস বা চার্জার ফ্যান-বাতি থাকলেও তা বেশিক্ষণ চালানো সম্ভব হয়নি। ফলে সন্ধ্যার পর ভোগান্তি বেড়ে যায়। অনেক বাসায় পানির সংকট দেখা দেয়। গরমে শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। সিলেট নগরীর মাছিমপুর ছড়ারপাড়ের বাসিন্দা আবুল মোহাম্মদ বলেন, বাসার ট্যাঙ্কের পানি দিয়ে কয়েক ঘণ্টা চললেও সন্ধ্যার পর সংকট দেখা দেয়। ময়মনসিংহের ভালুকা পৌর এলাকার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবুল হোসেন খান জানান, বাড়িতে তাঁর ও ছয়টি ভাড়াটিয়া পরিবার রয়েছে। দুপুর আড়াইটা থেকে বাসায় পানি সংকট দেখা দেয়। টানা চার ঘণ্টা অসহনীয় দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়।
তেল ও সিএনজি পাম্পে সংকট: বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক সিএনজি পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সিএনজি পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর। রাজধানীর পাম্পগুলোতে ডিজেল-পেট্রোল কেনার লাইন বেড়ে যায়। সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ, মদিনা মার্কেট-পাঠানটুলা ও আম্বরখানা এলাকার পেট্রোল পাম্পে পড়ে যায় দীর্ঘ লাইন। চট্টগ্রামেও বিভিন্ন পাম্পে ভিড় দেখা যায়।
বাজারে মোমবাতি নেই: বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যে বাজারে দেখা দেয় মোমবাতির সংকট। ১০ টাকার মোমবাতি ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গতকাল বিকেল ৪টার পর রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় বাড়তি দাম দিয়েও মোমবাতি মেলেনি। দোকানিরা বলছেন, মজুত শেষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী জিগাতলার বাসিন্দা মারজিয়া আলী ফিজ্জা জানান, বিকেল ৫টার দিকে ট্যানারি মোড়সহ জিগাতলার বিভিন্ন এলাকার দোকান ঘুরেও মোমবাতি পাননি। কোনো দোকানেই মোমবাতি নেই।
ফোন ও ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত: বিদ্যুৎ বিভ্রাটে টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবায়ও বিঘ্ন ঘটেছে। গ্রাহকরা জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনে কলড্রপ হচ্ছে। ইন্টারনেটের গতিও কম।
মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব) বলেছে, বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন সমস্যা হচ্ছে। সাময়িক সময়ের জন্য টেলিযোগাযোগ সেবা বিঘ্নিত হতে পারে। টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, মোবাইল ফোনের টাওয়ারগুলো বিকল্প ব্যবস্থায় দু-তিন ঘণ্টা চলতে পারে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দেশের একটা বড় অংশে টেলিযোগাযোগ সেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।
- বিষয় :
- জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়