ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছোট ভূমিকম্প বড় বিপদের বার্তা

ছোট ভূমিকম্প বড় বিপদের বার্তা
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৩ | ১৮:০০

ছুটির দিন। সকালের সূর্য উঠে গেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর ৫টা ৫৭ মিনিট ৮ সেকেন্ডে। কেউ ঘুম থেকে উঠেছেন, আবার কেউ গভীর ঘুমে। হঠাৎ ঝাঁকুনিতে কেঁপে উঠল সবকিছু। আতঙ্কে বিছানা ছাড়তে বাধ্য হলেন রাজধানীবাসী। অনেকে দ্রুত ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। কাঁপুনি অনুভূত হয়েছে আশপাশের জেলায়ও।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর ৫টা ৫৭ মিনিটে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৩। ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল ঢাকার দোহার থেকে ১৪.২ কিলোমিটার পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্বে, ঢাকার আজিমপুর থেকে ২৩.৪ কিলোমিটার দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে ২৪.৭ কিলোমিটার পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।

তবে ভূমিকম্পে কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবর জানিয়ে গতকাল ভোরেই রাজধানীর অনেক বাসিন্দা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন। রাজধানীর বছিলা ওয়েস্ট ধানমন্ডি হাউজিংয়ের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিন মোবারক বলেন, ‘জানালায় জোরে শব্দ হওয়ায় ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি পুরো ভবন যেন দুলছে। ১০-১৫ সেকেন্ড এ রকম ছিল।’ মিরপুরের বাসিন্দা গৃহবধূ নিলুফার বেগম বলেন, ‘নামাজ পড়ে পারিবারিক কাজ করছিলাম। এমন সময় দেখি ভবনটি দুলছে। ভূমিকম্প বুঝতে পেরে সবাইকে নিয়ে দ্রুত বাইরে চলে যাই।’

ছোট মাত্রার এ ভূমিকম্প বড় বিপদের বার্তা দিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায়। ফলে এখানে ভূমিকম্প হবেই। তাই ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্ধ করা, ভূমিকম্প-পরবর্তী জরুরি উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, ঢাকার ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে দোহার এলাকায় এ ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়।

তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (জিএসআই) বলছে, ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। এ এলাকায় গত ২৫ এপ্রিলও ভূমিকম্প হয়েছিল।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ভূমিকম্পটি ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে হওয়ায় এ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত তাঁরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, এর আগে যেসব ভূমিকম্প আমরা লক্ষ্য করেছি, সেগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৫-৪০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে। এই ভূমিকম্পটি সেগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনেকটাই অগভীর।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ঢাকার আশপাশে কিছু ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি বা ফাটল আছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরেও আছে। ছোট ও সরু নদী বা খাল এসব চ্যুতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এমন একটি চ্যুতি থেকেই ছোট ভূমিকম্প হতে পারে। ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায়, এ ধরনের ভূমিকম্পের প্রক্রিয়াকে ‘নিওটেকটনিক’ বলা হয়। এই নিওটেকটনিক প্রক্রিয়ার অংশ গতকাল ভোরের ভূমিকম্প। সাধারণত নিওটেকটনিক চ্যুতি থেকে বড় ভূমিকম্প হয় না। তিনি বলেন, ইছামতী নদী বা তার কোনো শাখা নদী কিংবা খাল ভূমিকম্পের উৎসস্থল হতে পারে। এমন ভূমিকম্প দেশে আগেও হয়েছে। নদীপথ নিয়ন্ত্রণ করে যে ফাটল রেখা, তা দিয়ে যখন ভূমিকম্প হয় সেই ভূমিকম্প বড় হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

ঢাকার কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তি আগেও হয়েছে

ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, বাংলাদেশের সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কয়েকটি প্লেট থাকার কারণে এসব এলাকা ভূমিকম্পের বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকায় গত কয়েক বছরের মধ্যে যেসব ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশের উৎপত্তিস্থলই ছিল বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল সিলেট বা চট্টগ্রাম অঞ্চলে। অনেক ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ভারতের মিজোরাম বা ত্রিপুরা রাজ্যে। তবে শুক্রবারের ভূমিকম্পের মতো ঢাকার আশপাশে উৎপত্তিস্থল রয়েছে, এমন ভূমিকম্পও মাঝেমধ্যেই হতে দেখা গেছে। এর আগে গত ২৫ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের তারাবো এলাকায় ৩ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।

ভূমিকম্প শনাক্তকারী সংস্থা আর্থকোয়েক ট্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১৮ মার্চ এই অবস্থানেই দোহার থেকে ১৪ দশমিক ২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ৪ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল। ঢাকার কাছে ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলেও গত ২০ বছরের মধ্যে একাধিক ছোট ছোট ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। গত ১৫ বছরে নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জে অন্তত চারবার ভূমিকম্প হয়েছে। দেশে সর্বশেষ ১৮২২ এবং ১৯১৮ সালে মধুপুর ফল্টে বড় ভূমিকম্প হয়। ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে।

যে বার্তা দিচ্ছে

রাজধানীর খুব কাছেই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হওয়ায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কেউ বলছেন, এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আবার কেউ কেউ বলছেন, আগামী কয়েক দিন সতর্ক থাকতে হবে। আরেকটি বড় ভূমিকম্প হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এ রকম ছোট ছোট ভূমিকম্প অতীতেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে যেহেতু আমরা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার কাছাকাছি আছি, সেহেতু সতর্ক থাকতে হবে।
প্রকৌশল ভূতত্ত্ববিদ মীর ফজলুল করিম বলেন, ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ছোট ভূমিকম্প হলেও তা সারাদেশে অনুভূত হয়েছে। সাধারণত এ মাত্রার ভূমিকম্প সারাদেশে অনুভূত হওয়ার কথা নয়। এটি আমাদের জন্য সতর্ক সংকেত। একটি ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের আগাম বার্তা দেয়। বাংলাদেশে আগাম বার্তা দিল কিনা, সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই। তবে আগামী কয়েক দিন সবাইকে সাবধানে থাকতে হবে। ভূমিকম্প হলে যা যা করতে হয়, সে রকম প্রস্তুতি থাকা দরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ১৩টি এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে তীব্র ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলা ও সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা। তবে ঢাকায় নরম মাটিতে ও জলাশয় ভরাট করে তৈরি সুউচ্চ স্থাপনা ভূমিকম্পে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহফুজুল হক বলেছেন, গত দুই দশকে ঢাকার নগরায়ণ প্রক্রিয়ায় পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের যেসব এলাকায় নগরায়ণ হয়েছে, সেসব এলাকার মাটির বৈশিষ্ট্য ও ভূতাত্ত্বিক গঠন নগরায়ণের উপযোগী নয়। ফলে ভূমিকম্প হলে মোহাম্মদপুরের বছিলার মতো এলাকায় দুর্যোগ ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ভূমিকম্পের রিটার্ন পিরিয়ড ধরা হয় ১৫০-২৫০ বছর। ১৭৬২ সালে আরাকান ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল, সাইকেল হিসেবে সেটি এখনও ফিরে আসেনি। আসলে ভূমিকম্পের পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়। যে কোনো মুহূর্তে বড় ভূমিকম্প হতে পারে। সে জন্য ব্যবস্থা একটাই, প্রস্তুতি নিতে হবে। 

আরও পড়ুন

×