ওয়াসার জনবল কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের আয়োজন
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ মে ২০২৩ | ২০:০৩
প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অস্থায়ী রাখার পরিকল্পনা নিয়ে জনবল কাঠামোয় (অর্গানোগ্রাম) বড় পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। এ অর্গানোগ্রাম কার্যকর হলে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত অনেক স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিমেষেই হয়ে যেতে পারেন অস্থায়ী! এ কারণে চাকরিজীবন শেষে তাঁরা প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি, পেনশনসহ সরকারি অন্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। অর্গানোগ্রামে এখনকার বেতন গ্রেড ও পদ-পদবিতেও খোলনলচে পাল্টানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব নিয়ে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়েছেন উৎকণ্ঠায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্গানোগ্রাম পরিবর্তনের যে তৎপরতা চলছে, তা বাস্তবায়িত হলে ওয়াসার পরিচালন খরচ অনেক বাড়বে। তখন গ্রাহককেও বেশি দামে পানি কিনতে হতে পারে।
ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, অতীতে বিভিন্ন সময়ে অর্গানোগ্রামে ছোটখাটো বদল আনা হয়েছিল। সে সময় প্রতিবারই কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুবিধাভোগীর সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধনী আনা হয়। তবে এবার সেটা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ওয়াসার শ্রমিক ইউনিয়ন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছে।
ঢাকা ওয়াসা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আনিসুজ্জামান শাহীন খান বলেন, আইন না মেনে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ প্রবিধানমালা পরিবর্তনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটিকে কোম্পানিতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। প্রবিধানমালার খসড়া অনুলিপি চাইলেও আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। বিষয়টি দুরভিসন্ধিমূলক। এতে শ্রমিক অসন্তোষ দানা বাঁধতে পারে।
এদিকে, খসড়া অর্গানোগ্রামটি গত ১৭ জানুয়ারি ঢাকা ওয়াসার ২৯৯তম বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়। তবে বোর্ড সদস্য বেশিরভাগই এতে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। খসড়া অর্গানোগ্রামের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়ে বিশদ আলোচনার জন্য পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছিল বোর্ড। তবে পরে আরও দুটি বোর্ড সভা হলেও অর্গানোগ্রাম আলোচ্যসূচিতেই রাখা হয়নি।
এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সদস্য ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব দীপ আজাদ সমকালকে বলেন, খসড়াটি দেখানোর পর আমরা অনেক প্রশ্নের উত্তর চেয়েছি। তারা ওই মুহূর্তে সেগুলোর উত্তর দিতে পারেনি। দিলে বুঝতে পারব সেটা ঢাকাবাসী ও ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুখকর হবে কিনা। তারপর বোর্ডের অনুমোদনের বিষয়টি আসবে।
কী আছে প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামে
২০০৮ সালের অর্গানোগ্রামে ৬২১ জন ছিলেন স্থায়ী কর্মকর্তা (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি)।খসড়া অর্গানোগ্রামে ৪৪৯ জনকে স্থায়ী জনবল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৫১ জনকে চুক্তিভিত্তিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা আছে। তাঁরা এক বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। দক্ষতার ভিত্তিতে তাঁদের চাকরি এক-দুই বছর পর নবায়ন করা হবে।
২০০৮ সালের অর্গানোগ্রামে স্থায়ী কর্মচারী (তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) ছিলেন ৩ হাজার ৭৩৪ জন। এবারের খসড়া অর্গানোগ্রামে ৮৬ জনকে স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে রাখার কথা বলা হয়েছে। বাকি ৪ হাজার ২৬৮ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁরাও এক থেকে সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে কর্তৃপক্ষ চাইলে তাঁদের চাকরি নবায়ন করবে। অন্যথায় তাঁরা চাকরি থেকে ঝরে পড়বেন।
ওয়াসার এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, বর্তমানে জেনারেল সার্ভিস শাখায় ১১১ পদে স্থায়ী জনবল রয়েছে। প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামে এটা নামিয়ে আনা হয়েছে ৮৬ জনে। তাহলে বাকি ২৫ জন কোথায় যাবে? হয় তাঁদের বাদ দিতে হবে, নয়তো দিতে হবে অন্য শাখায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। আর কর্তৃপক্ষ চাইলে তাঁদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের চেকও ধরিয়ে দিতে পারে। তবে কে বাদ পড়বেন, তা নিয়ে সবাই রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। এখনকার ৩ হাজার ৭৩৪ জন স্থায়ী কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ৮৬ জন স্থায়ী থাকবেন। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের পছন্দ-অপছন্দের শিকার হতে পারেন অনেকেই। কর্তৃপক্ষ মনে করলে তাঁদের বাদ দিয়ে নতুন জনবল চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দিতে পারবে। এতে নিয়োগ বাণিজ্যেরও সুযোগ তৈরি হবে।
আরেক কর্মকর্তা বলেন, প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রামের উদ্দেশ্য, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেন কখনোই মেরুদণ্ড শক্ত করে একজোট হয়ে কথা না বলতে পারেন, তাঁদের বিচ্ছিন্ন ও অনুগত রাখার কূটকৌশল হিসেবেই এমন অর্গানোগ্রাম প্রণয়নের আশ্রয় নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
পদবিতেও আসছে বদল
খসড়া অর্গানোগ্রামে একজন এমডি ও চারজন ডিএমডির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি বহাল থাকলেও প্রধান প্রকৌশলীর পদ একটির বদলে পাঁচটির প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী (পানি), প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন), প্রধান প্রকৌশলী (মেইনটেন্যান্স) এ রকম দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হবে পাঁচজনকে। একইভাবে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদ একটির বদলে রাখা হয়েছে ছয়টি। এ ক্ষেত্রেও ভিন্ন দায়িত্ব থাকবে তাঁদের। এতে ওয়াসার খরচ বাড়তে পারে।
এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ স্বীকৃত প্রকৌশলীদের কিছু পদবিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদবি করা হয়েছে উপপ্রধান প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলীর পদবি হবে সহকারী প্রধান প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর পদবি হবে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসার, সহকারী প্রকৌশলীর পদবি হবে ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসার এবং উপসহকারী প্রকৌশলীর পদবি হবে সহকারী ইঞ্জিনিয়ারিং অফিসার। এ ছাড়া ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে যাঁরা বিভিন্ন পদে কর্মরত, তাঁরা প্রকৌশল বিষয়ে কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তাঁদের পদবি হবে সুপারভাইজার।
ঢাকা ওয়াসা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওয়াজউদ্দিন ওয়াজেদ বলেন, পদবি পরিবর্তন করে লাভ কী। প্রচলিত নিয়মের বাইরে নতুন পদবি তৈরি করলে সাধারণ মানুষের বুঝতেও অসুবিধা হবে।
ঢাকা ওয়াসা ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রব বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে নামের পাশে সুপারভাইজার পদবি লাগলে তা হবে দুঃখজনক।
ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সদস্য ও ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম আবদুল হামিদ বলেন, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা বিদ্যমান পদবিতেই খুশি আছেন। তাঁদের পদবি পরিবর্তন করে সারাদেশের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের খাটো করা হচ্ছে।
ঢাকা ওয়াসা প্রবিধানমালা-১৯৯৬-এর ধারা ৪৯-এ বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে এই আইন বা কোনো বিধির সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, এই রূপ বিষয়ে অর্গানোগ্রামে সংশোধন করতে পারবে।
এ ছাড়া পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৬-এর ভিত্তিতে ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইনের ভিত্তিতে ২০১০-এর ৩১ মে প্রণীত প্রবিধানমালার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩ নম্বর নিয়োগ বিধিমালায় চারটি পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগের বিধান রয়েছে। এগুলো হলো সরাসরি, পদোন্নতির মাধ্যমে, প্রেষণে ও খণ্ডকালীন। ঢাকা ওয়াসার ২০০৮ সালের অর্গানোগ্রামে মাত্র পাঁচটি পদে অস্থায়ীভাবে নিয়োগের বিধান রয়েছে। এগুলো হলো– একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং চারজন উপব্যবস্থাপনা পরিচলক (ডিএমডি)। অন্য সবাই ঢাকা ওয়াসার স্থায়ী জনবল হবেন। তবে সেই বিধানকে অবজ্ঞা করে বিভিন্ন সময় প্রচুর সংখ্যক জনবলকে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এসব ক্ষেত্রেও স্বজনপ্রীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্গানোগ্রামে এত বড় ধরনের পরিবর্তন কোনোভাবেই ওয়াসা বোর্ড করতে পারে না। কারণ, সরকার নির্ধারিত বেতন গ্রেডেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে এই অর্গানোগ্রামে। প্রধান প্রকৌশলীর বেতন ধরা হয়েছে ওয়াসা নির্ধারিত ২ নম্বর গ্রেডে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বেতন ধরা হয়েছে ৩ নম্বর গ্রেডে। উপপ্রধান প্রকৌশলীর বেতন ধরা হয়েছে ৪ নম্বর গ্রেডে। এ ছাড়া স্মার্ট ওয়াসা গঠনের কথা বলে জনবল কমানোর কথা বলা হলেও খসড়া অর্গানোগ্রামে ৫৯৯ জন বাড়ানো প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন জনবল আছে ৪ হাজার ৩৫৫ জন। খসড়া অর্গানোগ্রামে তা করা হয়েছে ৪ হাজার ৯৫৪ জন।
ঢাকা ওয়াসার ডিএমডি (অ্যাডমিন) সৈয়দ গোলাম মোহাম্মদ ইয়াজদানি বলেন, অর্গানোগ্রাম নিয়ে একটি সভায় আলোচনা হয়েছিল। তবে বোর্ড সদস্যরা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। এখন দেখা যাক কী হয়।
ওয়াসার প্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মোস্তফা তারেক বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানের অর্গানোগ্রাম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল, পরিবর্ধনশীল ও পরিমার্জনশীল। তারই ধারাবাহিকতায় অর্গানোগ্রামটি আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এখনও এটা প্রাথমিক পর্যায়ে।
ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালনকারী স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব খায়রুল ইসলাম বলেন, ওয়াসা একটি অর্গানোগ্রাম করছে, এটা জানি। তবে ৯০ শতাংশ জনবলকে তারা চুক্তিভিত্তিক করে ফেলতে চাইলে তাতে মন্ত্রণালয় সায় দেবে না। তারা হয়তো কিছু জনবল বাড়াতে পারে। কারণ, ঢাকা ওয়াসার কাজের পরিধি বেড়েছে। তাদের তো ঢালাও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কথা বলা হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান বলেন, ডিজিটালাইজেশন ও কাজের ধরনের পরিবর্তনের কারণে অনেক জায়গাতেই জনবল কাঠামোর সংস্কার প্রয়োজন। সময়ের প্রয়োজনেই জনবল কাঠামো সংস্কারের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ের সঙ্গে সময়োপযোগী করে এবং কার্যক্রমের সঙ্গে মিল রেখে একটি যুগোপযোগী কাঠামো প্রণয়নের বিষয়টি চলমান। তাই এই মুহূর্তে কাঠামোর ব্যাপারে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।