ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সেমিনারে প্রশাসনের কর্মকর্তারা

সাড়ে ১৫ বছর প্রশাসন ছিল লুটেরাদের সহযোগী

সাড়ে ১৫ বছর প্রশাসন ছিল লুটেরাদের সহযোগী
×

ছবি: সংগৃহীত

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৪ | ২৩:৫৩ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৪ | ০১:০৪

প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেছেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছর দলীয় লুটেরাদের সহযোগী ছিল জনপ্রশাসন। এটি দুর্বৃত্তায়নের সহযোগীতে পরিণত হয়েছিল। এই সময়ে সিভিল প্রশাসনে একটি কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়। সম্পূর্ণ দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও সীমাহীন দুর্নীতির ফলে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। সেমিনারে প্রশাসনের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সঠিক ও উপযুক্ত জায়গায় বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের নীতি অনুসরণের দাবি জানানো হয়। 

শনিবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এ সেমিনারের আয়োজন করে। ‘প্রশাসনিক সংস্কার ও উন্নয়ন: বর্তমান প্রেক্ষিত ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ড. আনোয়ার উল্ল্যাহর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মোখলেস উর রহমান ও জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান। 

সেমিনারে উন্মুক্ত আলোচনায় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার পিয়ন থেকে সচিব পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নিজেদের লোকদের পুনর্বাসন করেছে। এসব সুবিধাভোগীকে অপসারণ না করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা যাবে না। একটি পেশাদার ও বুদ্ধিভিত্তিক আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে পুরো প্রশাসন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। 

সেমিনারে দলীয় লুটেরাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করা কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ব্যবস্থাকে সিভিল সার্ভিস বলা যাবে কিনা– এমন প্রশ্ন তুলেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া। তিনি বলেন, আমরা সাড়ে ১৫ বছরে সিভিল সার্ভিসকে কোন জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই কথা মাথায় রাখতে হবে। এটা কি আদৌ কোনো সার্ভিস ছিল? ওই সময়টা ছিল দলীয়করণকৃত লুটেরাদের সহযোগী। দেশের সমাজ, অর্থনীতি দুর্বৃত্তায়নকরণে সহযোগীদের একটি সার্ভিস। ওই সময় কাজ করেছেন এমন অনেকে মন খারাপ করতে পারেন। তবে এটা সত্যি যে, সেটা জনসেবার সার্ভিস ছিল না। এ রকম একটা সার্ভিস সাড়ে ১৫ বছর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের সঙ্গে মিলে দেশটাকে লুণ্ঠিত, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বিসর্জন, সুশাসনকে পুরোটা বিনষ্ট করে যে অবস্থায় নিপতিত করেছিল, সেই সার্ভিসটি একটি ভঙ্গুর সিভিল সার্ভিস, যেটি সিভিল সার্ভিস নামে অবহিত হতে পারে না। 

মুখ্য সচিব বলেন, ৫ আগস্টকে ভুলে গেলে হবে না। কারণ এর আগে যারা চাকরিতে ছিলেন, মঞ্চে উঠে স্লোগান দিয়েছেন, তাদের কেউই বিশ্বাস করেননি যে জুলাই-আগস্টের মতো ঘটনা ছাত্রদের মাধ্যমে হওয়া সম্ভব। এখানে উপস্থিত অনেক সাবেক কর্মকর্তা স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে নানাভাবে কাজ করেছেন। সেই সাক্ষী আমি। ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, বেসরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে ছিলেন। কিন্তু যারা কর্মরত ছিলেন, তাদের মধ্যে কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, পরিবর্তনের জন্য কিছু করেছেন? দু-একজন হয়তো করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। 

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীন পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সচিব) হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা, যোগ্যতা, সাহস ও দেশ গঠনে প্রত্যয়– এগুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে তদবির ও রাজনৈতিক লেজুড়ভিত্তিক গুরুত্ব দিলে যোগ্য জায়গায় যোগ্য ব্যক্তি নিশ্চিত করা যায় না। কর্মকর্তাদের সৎ সাহস ও যোগ্যতা অর্জনের উৎসাহও হারিয়ে যায়। 

অতিরিক্ত সচিব শেখাবুর রহমান বলেন, প্রশাসন যন্ত্র সবচেয়ে খারাপ হওয়ার মূলে একটি কারণ হলো রাজনৈতিক প্রভাব। এই প্রভাব থেকে যদি মুক্ত হওয়া যায়, তাহলে প্রশাসনে কর্মরত যারা দক্ষ, যোগ্য কর্মকর্তা আছেন, তারা অবশ্যই জনবান্ধব হিসেবে কাজ করতে পারবেন।

যুগ্ম সচিব সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রভাবমুক্তভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। একেবারে সচিব থেকে শুরু করে নিচের পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যেককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। 

সেমিনারে কর্মকর্তারা নানা সুপারিশ তুলে ধরেন। জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আবদুল মোমেন এইচএসসি পাস করার পরেই বিসিএস পরীক্ষার পক্ষে মতামত তুলে ধরেন। দক্ষ জনপ্রশাসনের জন্য প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোখলেস উর রহমান। ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা ও অফিসার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, অবিলম্বে প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। সাবেক যুগ্ম সচিব হারুনুজ্জামান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে উপসচিব এবং জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়নের পক্ষে মত দেন। বর্তমানে ইউএনও পদে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব এবং ডিসি পদে উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন দেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন

×