ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিষেধাজ্ঞা মানতে গিয়ে জেলেপাড়ায় নীরব দুর্যোগ

নিষেধাজ্ঞা মানতে গিয়ে জেলেপাড়ায় নীরব দুর্যোগ
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরায় সরকারের নিষেধাজ্ঞা টেকসই মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সময়ে জীবিকার তাগিদে ভয়াবহ সংকটে পড়ছেন দেশের ক্ষুদ্র জেলেরা, বিশেষত ভোলার উপকূলের মানুষ। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে বাধ্য হচ্ছেন নিষিদ্ধ বা অবৈধ জাল ব্যবহার করতে। এতে একদিকে যেমন মাছের পোনা, শৈবাল ও জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে জেলেরা জড়িয়ে পড়ছেন ঋণ আর দাদনদারের চক্রে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রজনন মৌসুমে ৮৭ শতাংশ জেলে পরিবারের আয় প্রায় শূন্যে নেমে আসে। স্বাভাবিক সময়ে যাদের মাসিক আয় ১০-১৫ হাজার টাকা, নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের আয় কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এই আর্থিক চাপ থেকে পারিবারিক অস্থিরতা, এমনকি নারী নির্যাতনের ঘটনাও ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
গতকাল সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে কোস্ট ফাউন্ডেশন। এতে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিম চৌধুরী, সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক মোস্তফা কামাল আকন্দসহ অন্য কর্মকর্তারা।

কোস্ট ফাউন্ডেশন ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মাঠতথ্য বিশ্লেষণ করে ভোলার ক্ষুদ্র জেলেদের জীবিকা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও ক্ষুদ্র জেলেদের জীবিকা সুরক্ষার কাঠামো এখনও দুর্বল। টেকসই উন্নয়ন ও ন্যায্য অর্থনীতির বাইরে থাকা এই মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে কারেন্ট জাল, মশারি জাল, প্লাস্টিক জাল, বিন্দি, ঠেলা বা খুটা জাল ব্যবহার করছেন, যা জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভোলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা এক লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু এর মধ্যে প্রায় ৮১ হাজার পরিবার এখনও কোনো সরকারি সহায়তা পাচ্ছে না। ইউনিয়নভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃত ক্ষুদ্র জেলে পরিবারের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অন্তত ২০ হাজার বেশি। 

শুধু ভোলা সদর উপজেলাতেই প্রকৃত ক্ষুদ্র জেলে পরিবারের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার, যার মধ্যে ৫৫ শতাংশের হাতে জেলে কার্ড থাকলেও তাদের মধ্যে মাত্র ৪৪ শতাংশ নিষেধাজ্ঞাকালীন সহায়তা পেয়েছেন। অর্থাৎ ভোলায় সামগ্রিকভাবে সহায়তা পাওয়ার হার ২৪ শতাংশের নিচে।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৩ শতাংশ পরিবার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার ১-২ মাস পরে চাল সহায়তা পেয়েছে, যা সময়মতো সহায়তা না পাওয়ার বাস্তবতা স্পষ্ট করে।

আয়ের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে 
সামাজিক টানাপোড়েন। গবেষণায় বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সময় আর্থিক অস্থিরতার কারণে পরিবারে কলহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, ৮৭ শতাংশ জেলে পরিবার কখনও কোনো প্রশিক্ষণ বা বিকল্প জীবিকার (আইজিএ) উপকরণ পায়নি। মাত্র ৫ শতাংশ পরিবার অন্য পেশায় যুক্ত হতে পেরেছে। 
গবেষণার তথ্য বলছে, ৬৫ শতাংশ জেলে পরিবার ঋণ শোধে পুনরায় দাদনদারের কাছ থেকেই ঋণ নিতে বাধ্য হয়। এভাবে ঋণচক্র আরও গভীর হচ্ছে, আর এর পরিণতিতে অনেক জেলে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বা আগাম মাছ বিক্রির চুক্তিতে জড়িয়ে পড়ছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুদ্র জেলেদের টেকসই উন্নয়নের জন্য ৯ দফা দাবি তুলে ধরে কোস্ট ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে রয়েছে– প্রকৃত জেলেদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে ইউনিয়ন পর্যায়ে তালিকা প্রকাশ; মাসে ন্যূনতম আট হাজার টাকা নগদ ও ৪০ কেজি চাল সহায়তা; নিষেধাজ্ঞা শুরুর ১৫ দিন আগে সহায়তা চালু এবং তা ট্র্যাক করার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা; সহজ শর্তে ঋণ ও ক্রেডিট সুবিধা; বিকল্প 
আয়ের জন্য প্রশিক্ষণ ও উপকরণ; নিষিদ্ধ জাল নির্মাণ ও ব্যবহার রোধে কঠোর নজরদারি; মান্দা সম্প্রদায়কে অবিলম্বে জেলে কার্ডের আওতায় আনা।
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণে গত ৩ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও মজুতের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। 

আরও পড়ুন

×