ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জ্বালানি পরিস্থিতি

গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, তবে সংকট পুরো কাটছে না

গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে, তবে সংকট পুরো কাটছে না
×

ফাইল ফটো

 হাসনাইন ইমতিয়াজ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৫ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রায় দুই মাস ধরে দেশে গ্যাসের সংকট চলছে। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ডের পর এই সংকটের সূত্রপাত হয়। গতকাল সোমবার একটি নতুন কার্গো আসায় এলএনজি সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে রাত ১০টায় গ্যাসের মোট সরবরাহ ২৫৮ কোটি ঘনফুট পেরিয়ে যায়। এর সুফল আজ মঙ্গলবার থেকে পাওয়া যাবে। 

সরবরাহ বাড়ায় শিল্প ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ, সিএনজি ও সার কারখানায় প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি থাকায় এসব খাতে সংকট পুরোপুরি কাটছে না।
এফএসআরইউতে দুর্ঘটনার পর এলএনজি সরবরাহ যেমন কমেছে, তেমনি দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। দুর্ঘটনার আগের দিন ২০ জুলাই দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। পরদিন টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ এক ধাক্কায় প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। ওই দিন দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন ছিল প্রায় ১৬৫ কোটি ৬০ লাখ ঘনফুট। আর এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে ৯৯ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট। 

গতকাল রাত ১০টায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৫৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬০ কোটি ২০ লাখ এবং এলএনজি থেকে ৯৮ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ দুর্ঘটনার পর দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন পাঁচ কোটি ৬০  লাখ ঘনফুট কমেছে। এতে এলএনজি সরবরাহ পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরলেও আগের মতো গ্যাস দিতে পারবে না পেট্রোবাংলা। কমপক্ষে পাঁচ কোটি ঘনফুট সরবরাহ কম হবে।

এর আগে গত ২২ আগস্ট দুপুর ১২টায় গ্যাসের সরবরাহ ছিল ২২০ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ ছিল মাত্র ৫৮ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট। অথচ ৩০ আগস্ট সকাল ৮টায় মোট সরবরাহ ছিল ২৪৪ কোটি ১০ লাখ ঘনফুট, যার মধ্যে এলএনজি ছিল ৮২ কোটি ৯০ লাখ। অর্থাৎ এলএনজি সরবরাহে ওঠানামার সঙ্গে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহেও বড় পরিবর্তন হয়েছে। 

দেশের দুই ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে এখন সামিটের টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। বাকিটা আসছে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো কোম্পানির একটি কার্গো এক্সিলারেটের টার্মিনালে যুক্ত হয়। এতে এক্সিলারেট থেকেও পূর্ণ মাত্রায় গ্রিডে গ্যাস দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা গতকাল রাত থেকেই শুরু হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় আজ রাতে যদি এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুটে নেওয়া যায়, তাহলে মোট সরবরাহ ২৫৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে। এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই গতকাল ব্যবসায়ী নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ আজ থেকে দেড় থেকে দুই মাস আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। 

সরবরাহ বাড়লেও দেশের গ্যাস পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ ২৫৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহেও ঘাটতি থাকবে প্রায় ১২৫ কোটি ঘনফুট।
জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব ও মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, মঙ্গলবার থেকে দুই টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হবে। এতে এলএনজি থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

জুলাইয়ের দুর্ঘটনায় সংকটের শুরু
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে টার্মিনালের একটি বয়লার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দৈনিক প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

এর প্রভাব পড়ে শিল্পকারখানা থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহক– সবখানে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমে লোডশেডিং বাড়ে। দীর্ঘ মেরামতের পর ১৫ আগস্ট এক্সিলারেটের টার্মিনালটি আবার পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত এলএনজি কার্গো না আসায় সরবরাহ দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

শিল্প ও আবাসিকে বাড়বে চাপ
টার্মিনাল দুর্ঘটনার পর শিল্প ও আবাসিকে গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ ১৪০-১৪৫ কোটি ঘনফুট থেকে ৯০-৯৫ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়। এটি আজ আবার ১৪০-১৪৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হতে পারে। বাড়তি গ্যাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শিল্প ও আবাসিক খাতে। স্বল্প চাপের কারণে যেসব কারখানা উৎপাদন কমিয়েছে বা নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ রেখেছে, সেখানে সরবরাহ বাড়তে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের কিছু এলাকার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। আবাসিক এলাকাতেও দীর্ঘ সময় ধরে কম থাকা গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়তে পারে।

বিদ্যুতে ঘাটতি থাকছে
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে দৈনিক ৮৫-৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। তবে সেখানে প্রয়োজন অন্তত ১২০ কোটি ঘনফুট। এতে বিদ্যুৎ খাতে বাড়তি গ্যাস না গেলে সংকট পুরোপুরি কাটবে না।
গতকাল বেলা ১১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট, উৎপাদন ১৪ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াট; ঘাটতি ছিল ৯২০ মেগাওয়াট। দুপুর ১২টায় ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার ১৭৩ মেগাওয়াট।
বিকেল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬৬ মেগাওয়াট, উৎপাদন ১৩ হাজার ৮১৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি দুই হাজার ৪৫৩ মেগাওয়াট। রোববার রাত ৯টায় চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪৭ মেগাওয়াট, উৎপাদন ১৫ হাজার ৭৫৯ মেগাওয়াট– ঘাটতি এক হাজার ২৮৮ মেগাওয়াট। 

সিএনজি ও সারে সংকট
সিএনজি খাতে দৈনিক চার-পাঁচ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন ১২-১৩ কোটি ঘনফুট। ফলে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও ঘাটতি বেশিই থাকছে। এতে সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন শিগগিরই ছোট হচ্ছে না। দেশের সার কারখানাগুলোতে দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ৩৩ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট। ফলে এ খাতেও ঘাটতি থাকছে প্রায় ১৮ কোটি ঘনফুট।

সেপ্টেম্বরে আসছে আরও ছয় কার্গো
চলতি মাসে মোট ৯টি এলএনজি কার্গো আসার নিশ্চয়তা মিলেছে। এর মধ্যে আরামকোর দুটি, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও পস্কোর একটি করে মোট চারটি কার্গো এরই মধ্যে দেশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো ও ২৮ সেপ্টেম্বর গানভর থেকে একটি করে মোট পাঁচটি কার্গো আসবে।

আরও পড়ুন

×