ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আলোচনা সভা

বাক্‌স্বাধীনতা প্রশ্নে বাহাস

বাক্‌স্বাধীনতা প্রশ্নে বাহাস
×

‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে - সংগৃহীত

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৩ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিএনপি সরকারের সাত মাসে অভূতপূর্ব বাক্‌স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। এ বক্তব্যের পর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তথ্য ভিন্ন কথা বলছে। বাক্‌স্বাধীনতা চর্চার কারণে হয়রানি ও আটকের ঘটনা রয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হেফাজতে মৃত্যু, গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাও রয়েছে। 

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।  
টিআইবি আয়োজিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নওশাদ জমির, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী, স্বতন্ত্র রাজনীতিক ডা. তাসনিম জারা প্রমুখ।

কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বাক্‌স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নিশ্চিত করা হয়েছে দাবি করে মাহদী আমিন বলেন, ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল একবারে মূলোৎপাটন করা কঠিন। সরকারের সাত মাসে রাষ্ট্র পরিচালনায় একবারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যু ঘটেনি, বিরোধী দলের মত, বা ভিন্ন আদর্শও হরণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, আমরা দেখছি ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাকস্বাধীনতা। যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে অশালীন বা অশ্রাব্য আচরণও করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতা এবং সহাবস্থান। কারণ, এটাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা।

এরপর ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিএনপি সরকারের সময়ে বাক্‌স্বাধীনতা চর্চার কারণে কমপক্ষে ৫২টি বিভিন্ন ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫৮ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগকে আটক করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এই আইনে আটক করা প্রত্যাশিত ছিল না।

তিনি বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৭৩০ এর বেশি। ধর্ষণে কমপক্ষে ৫০ জনের মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে। আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি। সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্তত একটি গুমের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জড়িত।

আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশনের মতো অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের সময় অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। পরিবর্তন কিছুই হয়নি। এক বা একাধিক ব্যক্তির হাতে পুরো আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়া এখন একধরনের জিম্মি দশার মধ্যে আছে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, যারা অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, যারা দায়ী, তাদের ওপরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। যা গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না।
পরে আবার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, রাষ্ট্রীয় মদদে কিছু হচ্ছে না। আগে একটি নির্দিষ্ট অফিস বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপ করা হতো। এখন রাষ্ট্রের কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রায় ১০০ অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করাকে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যারা সরাসরি আইন প্রণয়নে জড়িত, তাদের কাছে প্রয়োজনীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। খসড়াও অনেক আগে প্রকাশ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আইন প্রণয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। কোনো আইন প্রণয়নের পরও তা সংশোধনের সুযোগ থাকে। আইনগুলোকে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। একবারে শতভাগ পরিবর্তন সম্ভব নয়, পৃথিবীর কোথাও তা হয় না। বিভিন্ন পর্যায়ে অংশীজনের সঙ্গে কথা হচ্ছে, তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। যেখানে প্রয়োজন, সংশোধনও করা হচ্ছে।

আলোচনা সভায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এ খাতে অনেক সমস্যা রয়েছে। এগুলো ১৭ বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা। এক দিন বা এক মাসে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তবে কীভাবে পরিবর্তন আনা যায়, তা নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। 

সরকার নারী ও তরুণদের যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, বিএনপি সরকারের ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ। এত দিন যে সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল, তাদের ক্ষমতার উৎস ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র, বিভিন্ন বাহিনী, বিচার বিভাগ, প্রশাসন কিংবা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি। সে কারণে দেশে গণতন্ত্রের ঘাটতি ছিল, ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল এবং স্বৈরশাসন মাথাচাড়া দিয়েছিল।
নওশাদ জমির বলেন, বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে কীভাবে দেখতে চাই, তা নিয়ে ৫০ বছর বা ১০০ বছর সামনে তাকাতে হবে। এমনকি হতে পারে না, সারা পৃথিবী থেকে ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশে পড়াশোনা করতে আসবে? বাংলাদেশের গণমাধ্যম সারা বিশ্বের জন্য উদাহরণ হবে?

প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নওশাদ জমির বলেন, শুধু কাগজে-কলমে ভালো প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই হবে না। প্রতিষ্ঠান কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সেখানে জবাবদিহির চর্চা কতটা রয়েছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডের লিখিত সংবিধান ছাড়াই গণতন্ত্রের চর্চা রয়েছে। তাই কাগজে কী লেখা হলো, তার চেয়ে গণতন্ত্রের অনুশীলন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মনীষা চক্রবর্তী বলেন, গণতন্ত্র আজ জনগণের বদলে ‘অব দ্য বিজনেসম্যান, ফর দ্য বিজনেসম্যান, বাই দ্য বিজনেসম্যান’-এ রূপ নিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো ছাত্র-শ্রমিক-জনতার বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রে ঋণখেলাপিদের সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
তাসনিম জারা বলেন, জাবাবদিহি নিশ্চিতকারী তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো কারও নিয়ন্ত্রণে থাকলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সামাজিক মাধ্যমে সুসংগঠিত অপপ্রচার চালিয়ে রাজনৈতিক বুলিং ও সহিংসতা সৃষ্টি করে তারা তরুণদের দমাতে চায়।

আরও পড়ুন

×