ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাড়ছে বাসের ভাড়া, বেড়েছে পরিবহন ব্যয়

বাড়ছে বাসের ভাড়া, বেড়েছে পরিবহন ব্যয়
×

ছবি: সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:৫৪

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে বাড়তে যাচ্ছে বাসের ভাড়া। গত রোববার দিবাগত রাতে ডিজেলের বর্ধিত দাম কার্যকরের পর বেড়ে গেছে পরিবহন ব্যয়। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যাত্রীবাহী বাসের ভাড়া কিলোমিটারে দূরপাল্লায় ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। যদিও আসনবিন্যাসের কারণে ভাড়া বাড়বে আরও বেশি। তবে সরকারের অনুমোদন পাওয়ার আগেই সোমবার বিভিন্ন রুটের বাসে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়। লঞ্চের ভাড়া সরকারি সিদ্ধান্তের বৃদ্ধির আগেই খেয়া ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজধানী ঢাকার কিছু বাসে সোমবারই বর্ধিত ভাড়া নেওয়া হয়। রাজধানীর ফার্মগেট থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে সাইনবোর্ডের দূরত্ব ১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা হিসেবে এ পথের ভাড়া ৩৭ টাকা। তবে এই রুটের লাব্বাইক পরিবহনে আগেই নেওয়া হতো ৪০-৪৫ টাকা। ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে সোমবার নেওয়া হয় ৫০। দূরপাল্লার বাসেও ভাড়া বৃদ্ধির খবর মিলেছে। দক্ষিণবঙ্গ থেকে ঢাকার রুটের বাসে এদিন যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা করে বেশি নেওয়া হয়। 

ডিজেল-পেট্রোলের দামে রেকর্ড
ইরানের পর সৌদি আরব-ইয়েমেন যুদ্ধে আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে তেলের দাম। এর প্রভাবে রোববার রাতে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

গত ২১ এপ্রিল ডিজেলে ১৫ টাকা বৃদ্ধি করে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল সরকার। এর আগে ২০২২ সালের ৬ আগস্ট ডিজেলের দাম ৮০ থেকে বৃদ্ধি করে ১১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে কয়েক ধাপে দাম কমে। ডিজেলের ১৩৫ টাকা দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

গত এপ্রিলে পেট্রোলের দাম ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। জুনে তা হয় ১৪০ টাকা। এবার হয়েছে ১৬০ টাকা। অকটেনের দাম এপ্রিলে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা হয়েছিল। জুনে হয় ১৪৫ টাকা। এবার হয়েছে ১৬৫ টাকা।

২০২২ সালের আগস্টে পেট্রোলের দাম ৮৭ টাকা লিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৩০ টাকা হয়েছিল। ৮৯ টাকার অকেটন হয়েছিল ১৩৫ টাকা। পরে কয়েক দফায় কমে পেট্রোল ও অকটেনের দাম প্রায় দুই বছর ১১৬ ও ১২০ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকারের মতো যানবাহন চলে অকটেন ও পেট্রোলে। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ, ট্রেন, ইঞ্জিনচালিত নৌকার মতো বাণিজ্যিক যানবাহন চলে ডিজেলে। রেল ছাড়াও যাত্রীবাহী বাস ও লঞ্চের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে। বাকি যানবাহন চলে চুক্তিতে। পরিবহন খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির ৯০ শতাংশই ডিজেল। 

ভাড়া বৃদ্ধিতে দেনদরবার
বাসের ভাড়া বৃদ্ধির জন্য দুপুরে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কাছে প্রস্তাব করে বাস মালিকদের সংগঠন সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। মালিকপক্ষ ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলা বাসে ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ২ টাকা ৭৩ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করে। দূরপাল্লার ৫১ আসনের বাস ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করে। উভয় ক্ষেত্রে এর সঙ্গে ২০২২ সাল থেকে ডলারের দাম যত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ভাড়াও তত শতাংশ বৃদ্ধির দাবি করে। এতে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যেত। 

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম সমকালকে বলেন, ২০২২ সালের পর ভাড়া পুনর্নির্ধারণে জ্বালানি তেল ছাড়া কোনো কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এই সময়ে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে ১২৩ টাকা হয়েছে। এ কারণে বাসের প্রতিটি যন্ত্রাংশ এবং আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধিতে ১১ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়। যদিও বিআরটিএর ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির প্রস্তাব ছিল ২২ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছিল, দেশের আর্থিক পরিস্থিতির কারণে শুধু তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। তেলের দাম কমলে অন্যান্য ব্যয় সমন্বয় করে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হবে। মালিকরা তা মেনে নিয়েছিলেন। এখনও আর্থিক অবস্থা ঠিক হয়নি। তাই ডিজেলের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধিতে ২০ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব মালিকরা মেনে নিয়েছেন।

ভাড়া কত বৃদ্ধি পেতে পারে, তা সুপারিশে বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণ কমিটি সংস্থাটির বনানী সদর কার্যালয়ে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভাড়া যৌক্তিক হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হবে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় তা গ্রহণ করলে আজ মঙ্গলবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হবে। মালিকরা অবশ্য সোমবার রাতেই প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব করেন। 

ভাড়া বাড়বে বেশি
কিলোমিটারে ২০ এবং ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও আসলে ভাড়া বাড়বে আরও বেশি। গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোয় ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা। অন্যদিকে দূরপাল্লার পথে ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা। ভাড়া নির্ধারণ কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, তারা নগর পরিবহনের ভাড়া ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। মন্ত্রণালয় তা থেকে কিছু কমাতে পারে।

দূরপাল্লায় ৫২ আসন ধরে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও অধিকাংশ বাস ৪০ আসনের। আরামদায়ক যাত্রার জন্য অনেক বাসে আসন সংখ্যা ৩২ থেকে ৩৬টি। আসন কমলে ভাড়া বাড়ে। ফলে দূরপাল্লার নন-এসি বাসে ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা হলেও ৪০ আসনে তা ২ টাকা ৯০ পয়সা। ৫২ আসনের বাসে ২ টাকা ৪৩ পয়সা নির্ধারণ করা হলে ৪০ আসনের ক্ষেত্রে তা হবে ৩ টাকা ১৬ পয়সা। জানিয়েছে

কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ‘ফুয়েল সারচার্জ’
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, ডিজেলের দাম বাড়ানোয় বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারর্চাজ’ আরোপ করেছে। কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে এই চার্জ কার্যকর করা হবে বলে সোমবার বিকডার মহাসচিব স্বাক্ষরিত সার্কুলারে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানোয় সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে, যা সোমবার থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দেন তারা। 

একই পথে হাঁটছে বার্থ অপারেটরস শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তারাও দর বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সংগঠনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করে নতুন দর নির্ধারণের জন্য চিঠি দিয়েছেন। তবে ব্যবসায়ীরা হঠাৎ দর বাড়ানোর এমন প্রচেষ্টাকে অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন। 

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, তেলের দাম বাড়ানোয় বাধ্য হয়ে মূল্য সমন্বয় করেছেন তারা। বিষয়টি আইসিডি ব্যবহারকারীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিকডা জানায়, তাদের ফুয়েল সারচার্জের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর এবং আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন চার্জ, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) এবং আইসিডির মধ্যে খালি কনটেইনার পরিবহন চার্জ, খালি কনটেইনার লিফট-অন বা লিফট-অফ চার্জ, রপ্তানি পণ্য স্টাফিং/ হ্যান্ডলিং প্যাকেজ চার্জ, রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের ভিজিএম চার্জ, আমদানি পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ চার্জ।

রপ্তানি পণ্য স্টাফিং বা হ্যান্ডলিং প্যাকেজ চার্জের মধ্যে রয়েছে– স্টাফিংয়ের পর লোড ইয়ার্ডে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন, লোড ইয়ার্ডে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার লিফট-অফ, এম্পটি ইয়ার্ডে খালি কনটেইনার লিফট-অন, এম্পটি ইয়ার্ড থেকে সিএফএস শেড পর্যন্ত খালি কনটেইনার পরিবহন, খালি কনটেইনারে রপ্তানি পণ্য স্টাফিং, ভেসেল বা জাহাজ নির্ধারণের পর লোড ইয়ার্ডে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার লিফট-অন এবং চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটিতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন।

আমদানিকৃত পণ্য ডেলিভারি প্যাকেজ চার্জের মধ্যে রয়েছে– আইসিডিতে কনটেইনার নামানো (লিফট-অফ), আমদানি ডেলিভারি ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখা এবং কনটেইনার থেকে ট্রাকে আমদানি পণ্য খালাস ও ডেলিভারি (শ্রমিকসহ) এবং চট্টগ্রাম বন্দর বা পিসিটি থেকে আইসিডিতে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার পরিবহন।

শুধু বন্দর নয়, চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন চালক ও হেলপাররা। কোনো কোনো রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ১০ নম্বর রুটের বাসে ২ নম্বর গেট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত আগে ১৫ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও সোমবার কোনো কোনো বাসে নেওয়া হয়েছে ২০ টাকা। 

নগরের ১০ নম্বর রুটের একটি বাসে ২ নম্বর গেট থেকে আগ্রাবাদ যাওয়ার সময় ২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয় বলে জানান শিক্ষিকা হাসনা হেনা। তিনি বলেন, ‘আগে এই দূরত্বের ভাড়া ১৫ টাকা দিয়েছি। আজ ২০ টাকা চাওয়া হয়েছে। পাঁচ টাকা বাড়তি নেওয়া হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×