ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার ছিল মরিয়াম, অভিযোগ বাবার

শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার ছিল মরিয়াম, অভিযোগ বাবার
×

মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহ

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৩:৩৩

মাসখানেক আগে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগমকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ-সংলগ্ন ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে তোলেন সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলাম। সেখানে তিনি ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম শারীরিক ও মানসিকভাবে মরিয়ামকে নির্যাতন করতেন। মামলার এজাহারে মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহ এই অভিযোগ করেছেন।

তবে গতকাল সোমবার রিমান্ড শুনানি শেষে আদালতে সাতক্ষীরা-৪ আসনের বিতর্কিত এমপি নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম না। সে (মরিয়াম) আত্মহত্যা করেছে।’ মরিয়ামকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

মরিয়ামকে আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলায় এমপি গাজী নজরুল এবং তার স্ত্রী মাকছুদাকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল ঢাকার সিএমএম আদালত শুনানি শেষে গাজী নজরুলকে চার দিন এবং মাকছুদাকে এক দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।

রোববার রাতে ন্যাম ভবনে গাজী নজরুলের ফ্ল্যাট থেকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ামের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শেরেবাংলা নগর থানায় নেওয়া হয়।

পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল দাবি করেন, দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে মরিয়াম তার কক্ষে চলে যান। তিনি পাশের কক্ষে ছিলেন। তখন প্রথম স্ত্রীও বাসায় ছিলেন। ৫টার দিকে মরিয়ামের ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে ডাকাডাকি করেন। পরে জানালা দিয়ে তাকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতে দেখেন।

পুলিশ জানায়, রোববার গভীর রাতে মরিয়ামের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় গাজী নজরুল, মাকছুদা ও মরিয়ামের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। ওই মামলায় গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল দুপুরে আদালতে নেওয়া হয়। প্রথমে তাদের ঢাকার সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
 
থানা থেকে মামলাটি স্থানান্তর করে গতকাল বিকেলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে রিমান্ড মঞ্জুরের পর আদালত থেকে গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে তদন্তসংশ্লিষ্টরা মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যান। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে,  মাসখানেক আগে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগমকে ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে তোলেন গাজী নজরুল।

গাজী নজরুল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়ে সাতক্ষীরা থেকে তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হয়ে তৃতীয়বারের মতো এমপি হন গাজী নজরুল। 
গত জুলাইয়ে সামাজিক মাধ্যমে এমপি গাজী নজরুলের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মুখে গাজী নজরুল নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার বাসায় বিয়ে হয়। ২২ জুলাই নৈতিক স্খলনের দায়ে দল থেকে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করে জামায়াতে ইসলামী।

গতকাল বিকেল ৩টার দিকে গাজী নজরুল ও তার স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার। আদালতে নেওয়ার সময় তাদের হাতে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুকে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট ছিল। অবশ্য কাঠগড়ায় নেওয়ার পর এসব খুলে দেওয়া হয়।

রিমান্ড শুনানির সময় ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী গাজী নজরুলের রাজনৈতিক প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে বিচারক তাকে থামিয়ে দিয়ে মামলার বিষয়ে বলতে বলেন। তিনি রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘মামা ওবায়দুর রহমানকে প্রলোভন দেখিয়ে মরিয়ামকে বিয়ে করেন এমপি গাজী নজরুল। প্রথম স্ত্রীকেও রাজি করান মরিয়ামকে বিয়ে করাতে। তারা ন্যাম ভবনে বাস করতেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনা অভিযোগে মামলা হয়েছে। হত্যার বিষয় উড়িতে দিতে পারি না।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহ সমকালকে বলেন, গাজী নজরুল তার আপন খালু। নজরুলের সঙ্গে মরিয়ামের সম্পর্কে জড়ানোর নেপথ্যে কাজ করেছেন তার শ্যালক ওবায়দুর রহমান। ওবায়দুর টাকার জন্য নজরুলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে দিয়ে মরিয়ামকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছেন। নজরুলের কাছে মরিয়াম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

নজরুলের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হওয়া চিরকুট সম্পর্কে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘ওটা মরিয়ামের হাতের লেখা কিনা জানি না। তার হাতের লেখা খুব একটা চিনি না। নির্যাতনের শিকার হলেও মরিয়াম কোনো কিছু জানায়নি আমাকে।’

এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেছেন, গত জুনে তার শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়ামের বিয়ে হয়। এর পর থেকে ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে মরিয়াম বসবাস করতেন। ওই বাসায় গাজী নজরুল ও মাকছুদা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে মরিয়ামকে নির্যাতন করতেন।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল মোবাইল ফোনে বাদী মাসুম বিল্লাহকে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে তিনি মেয়েকে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় ঝুলে থাকতে দেখেন। এজাহারে বলা হয়েছে, বেলা আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো এক সময় ঘটনাটি ঘটেছে।

খবর পেয়ে সন্ধ্যা ৭টায় পুলিশ ওই বাসায় গিয়ে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে লাশ উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিট আলামত সংগ্রহ করে। এ সময় সেখান থেকে চিরকুট পাওয়া যায়। সেগুলো মরিয়ামের লেখা বলে ধারণা পুলিশের। চিরকুটে বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা এবং গাজী নজরুলের কারণে বিপর্যস্ত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। লেখাটি মরিয়ামের কিনা, তা ফরেনসিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানায় পুলিশ।

রাত ১০টার দিকে লাশ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। গতকাল বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন তারা।

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। দুই আসামিকে ডিবি আদালত থেকে মিন্টো রোডের কার্যালয়ে নিয়ে গেছে। ডিবি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। 

গাজী নজরুলের কুশপুত্তলিকা দাহ
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মরিয়ামের মৃত্যুর ঘটনায় গাজী নজরুলের ফাঁসির দাবিতে শ্যামনগরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। উপজেলা সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে গতকাল বেলা ১১টায় পৌর সদরে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। 
শুরুতে জেসি কমপ্লেক্স চত্বর থেকে বিক্ষুব্ধ জনতা মিছিল নিয়ে পৌর সদরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে উপজেলা প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে অবস্থান নিয়ে তারা গাজী নজরুলের কুশপুত্তলিকায় জুতাপেটা ও অগ্নিসংযোগ করে।

সমাবেশ চলাকালে বক্তব্য দেন নওয়াবেঁকী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান মিঠু, নুরনগর পাবলিক লাইব্রেরির আহ্বায়ক আবু ইউসুফ, ভুরুলিয়া সমবায় ক্লাবের সভাপতি রফিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলহাজ্ব আবুল কালাম মোড়ল, তরুণ সমাজসেবক রেজাউল ইসলাম প্রমুখ।

বক্তারা মরিয়ামের মৃত্যুর জন্য গাজী নজরুলকে দায়ী করেন। নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েটি একটি চাকরির আবেদন করতে গিয়ে এমপি গাজী নজরুলের খারাপ নজরে পড়ে।

আরও পড়ুন

×