বিমানের কাছে দুই প্রতিষ্ঠানের বকেয়া সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা
রেকর্ড মুনাফার দাবি বিমান কর্তৃপক্ষের
শহিদুল আলম
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে সরকারের দুটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পাওনা সাত হাজার ৭৫৬ কোটি টাকার বেশি। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটির দাবি, তারা রেকর্ড মুনাফা করছে। পাঁচ বছর ধরে লাভজনক অবস্থানে আছে সংস্থাটি। এদিকে বিমানের বহরে আরও ২১টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার তোড়জোড় চলছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বকেয়া পাওনা পাঁচ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৯৭৪ টাকা। পদ্মা অয়েল পিএলসির পাওনা এক হাজার ২৩২ কোটি ৭১ লাখ ১৬ হাজার ৩৮২ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিমানের কাছে পদ্মা অয়েলের পাওনা পরিশোধের ব্যাপারে গত বছর ২১ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। এতে সিদ্ধান্ত হয় বিমানপ্রতি মাসে পদ্মা অয়েলকে অন্তত ২৫ কোটি টাকা দেবে।
জানতে চাইলে পদ্মা অয়েল পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (এভিয়েশন) অনুপ কুমার বড়ুয়া সমকালকে বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি মাসে ২৫ কোটি টাকা পদ্মা অয়েলকে দিচ্ছে বিমান কর্তৃপক্ষ।
২০১১ থেকে ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে পদ্মা অয়েল কোম্পানির মোট বকেয়া পাওনা ছিল দুই হাজার ১০৮ কোটি ১৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। গত বছরের ২১ জানুয়ারি আন্তঃমন্ত্রণালয়ে সভার পর থেকে প্রতিমাসে ২৫ কোটি টাকা পরিশোধ করছে বিমান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেছেন, বিমান কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৮৭৫ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার ৮৯২ টাকা বকেয়া পরিশোধ করেছে। তবে এখনও পাওনা রয়েছে এক হাজার ২৩২ কোটি ৭১ লাখ ১৬ হাজার ৩৮২ টাকা।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ সমকালকে জানিয়েছেন, গত আগস্ট পর্যন্ত বিমানের বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জের বকেয়া এবং সারচার্জ মিলিয়ে মোট পাওনা দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৮৪২ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ৮৭৪ টাকা। এ বিষয়ে বিমান কর্তৃপক্ষকে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ওই পাওনা টাকা পরিশোধ করা হয়নি।
এদিকে বিমান কর্তৃপক্ষের দাবি রেকর্ড মুনাফা করছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থা। গত অর্থবছর (২০২৪-২৫) যাত্রী পরিবহন করে ৭৮৫ কোটি টাকা লাভ করেছে বিমান। গত পাঁচ বছর টানা লাভের মধ্যে আছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জেনারেল ম্যানেজার কাস্টমার সার্ভিস ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিমানের বহরে আধুনিক মানের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর চারটিসহ মোট এয়ারক্রাফট হচ্ছে ১৯টি। বিমান এয়ারলাইন্সের এসব উড়োজাহাজ যাত্রীসেবায় দেশের অভ্যন্তরীণ রুটসহ বিদেশের নামিদামি শহরকেন্দ্রিক বিমানবন্দরগুলোতে উড্ডয়ন-অবতরণ করছে। বিমানের এ কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমানে টানা লাভের মধ্যে রয়েছে এয়ারলাইন্সটি।
বিমানের বহর ভারী করতে আরও আধুনিক মানের ১১টি বোয়িংসহ ২১টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, অর্থায়ন, বিমানবহরের পরিচালন ব্যয় ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি আরও ১১টি বোয়িং ও ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার পৃথক চুক্তির পথে এগোচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে তাদের সংগ্রহ তালিকায় মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা হবে ৩৫।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের আরেক কর্মকর্তা জানান, সংস্থাটির কারিগরি-আর্থিক কমিটি (টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটি) প্রস্তাবিত এয়ারবাস সংগ্রহের বিষয়ে তাদের কাজ ৩১ আগস্টের মধ্যে সম্পন্ন করেছে এবং বিমানের পরিচালনা পর্ষদের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পর্ষদের একটি উপকমিটিও তাদের কাজ শেষ করেছে এবং প্রস্তাবিত চুক্তির আগে উভয় পক্ষ এখন চূড়ান্ত পর্যালোচনা চালাচ্ছে। এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য বিমান কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে তাদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। যদিও সেই সময়সীমা চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই পার হয়ে গেছে, তবুও কর্মকর্তারা এখন আশা করছেন চলতি সেপ্টেম্বরে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে যাবে।
সূত্রমতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স শিগগির যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বোয়িং ও এয়ারবাস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা।
চুক্তিগুলো চূড়ান্ত হলে, গত এপ্রিলে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজের জন্য স্বাক্ষরিত ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তির পাশাপাশি এগুলো যুক্ত হবে। এতে মোট বোয়িং উড়োজাহাজ হবে ২৫টি।
বিমানসংশ্লিষ্টরা আরও জানান, বিমানের ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে ড্যাশ ৮ হচ্ছে পাঁচটি। প্রতিটির আসন সংখ্যা ৭৪। চলাচল করছে দেশের অভ্যন্তরীণ ও কলকাতা রুটে। বোয়িং ৭৩৭-৮০০ হচ্ছে চারটি। প্রতিটি উড়োজাহাজের আসন সংখ্যা ১৬২। গন্তব্য দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য। বোয়িং ৭৮৭-৮ উড়োজাহাজ আছে চারটি। প্রতিটির আসন সংখ্যা ২৭১। গন্তব্য দূরপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকা। বোয়িং ৭৮৭-৯ হচ্ছে দুটি। প্রতিটির আসন সংখ্যা ২৯৮। বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর হচ্ছে চারটি। প্রতিটির আসন সংখ্যা ৪১৯। চলাচল করছে মধ্যপ্রাচ্যে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেডের আগের নাম ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর যাত্রা শুরু ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন অভ্যন্তরীণ সেবার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে বিমান। ভারত থেকে নিয়ে আসা ম্যাকডনেল ডগলাস ডিসি-৩ ছিল প্রথম সংযোজন; যেটি ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, যশোর এবং সিলেটের যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। এরপর ১৯৭২ সালের ৭ মার্চ চট্টগ্রাম ও সিলেটে এবং ৯ মার্চ যশোরে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। এর আগে ৪ মার্চ ১৭৯ জন যাত্রীকে লন্ডন থেকে ঢাকায় আনার মধ্য দিয়ে বিমানের প্রথম আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সম্পন্ন হয়।
- বিষয় :
- বিমান