ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আবাসন সংকটে হলের বাইরে থাকেন ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী

আবাসন সংকটে হলের বাইরে  থাকেন ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী
×

 সাব্বির নেওয়াজ 

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৩২

মেধার লড়াইয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশের ৬১ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে এখন ৫৮টিতে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। এই ৫৮ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় দুজন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকতে পারছেন না।

তথ্য বলছে, মোট শিক্ষার্থীর ৭৯ দশমিক ৮১ শতাংশেরই আবাসিক সুবিধা নেই। তাদের থাকতে হচ্ছে মেস, ভাড়া বাসা, সাবলেট কিংবা ক্যাম্পাস-সংলগ্ন বাসাবাড়িতে। এতে উচ্চশিক্ষার ব্যয়ের সঙ্গে যোগ হচ্ছে বাড়তি খরচ। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের পরিবারের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ। আর দীর্ঘ যাতায়াত ও অনুপযুক্ত আবাসন পরিবেশের কারণে পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অধিভুক্ত কলেজ বাদ দিয়ে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ৫১ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯ জন। এর মধ্যে তিনটি (জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়) বাদে বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ৪৮ লাখ ২১ হাজার ১৬৫ জন। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ৩৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৫ জন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৩ লাখ ৯৫ হাজার ৫৪১ জন। এ ছাড়া দেশের ফাজিল (ডিগ্রি স্তর) ও কামিল (মাস্টার্স) স্তরের অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোতে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৫ লাখ ৩ হাজার ৫৮০। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রায় ৫২ লাখ ছাত্রছাত্রীর জন্য ২৩২টি আবাসিক হল ও ডরমিটরিতে আসন রয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৮৭টি। অর্থাৎ ৫০ লাখ ৭৩ হাজার ৭৯২ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সুবিধার বাইরে, যা শতাংশের হিসাবে ৭৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। বাকি ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ ছাত্রছাত্রী আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে সংকটের তীব্রতা আরও বেশি। দেশের কয়েকটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক সুবিধা পান ২০ শতাংশেরও কম শিক্ষার্থী। কোথাও আবার একটি মাত্র হলের ওপর নির্ভর করছেন প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, পরিকল্পিতভাবে আবাসিক অবকাঠামো গড়ে তোলায় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে সমস্যাটি শুধু আর্থিক ঘাটতি নয়; শিক্ষার্থী বৃদ্ধি, আসন পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও সামনে আসছে।

১৯ হাজার শিক্ষার্থী, হল মাত্র একটি
আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় উদাহরণ রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য এ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল মাত্র একটি। সেখানে থাকার সুযোগ পান প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী। বাকি সব শিক্ষার্থীকে মেস বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে।

এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহাতির হাসানের বাড়ি নড়াইল। শান্তিনগরে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকেন দুই বন্ধুর সঙ্গে। তিনি জানান, শুধু ভাড়া বাবদ তাঁর মাসে খরচ হয় ৪ হাজার ২০০ টাকা। খাবার, যাতায়াতসহ সব মিলিয়ে মাসিক খরচ দাঁড়ায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা।

মাহাতিরের ভাষ্য, ভাড়া বাসায় থাকার বাড়তি খরচের পাশাপাশি প্রতিদিন শান্তিনগর থেকে পুরান ঢাকায় ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে হয়। যানজটের কারণে নষ্ট হয় মূল্যবান সময়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সুবিধা না থাকায় আমার মতো অনেক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের সংকট বেশি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। তথ্য অনুযায়ী, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ শতাংশ ছাত্রী এবং ৩৪ শতাংশ ছাত্র ক্যাম্পাসের বাইরে থাকছেন। অর্থাৎ ছাত্রীদের ক্ষেত্রে সংকট তুলনামূলক বেশি।

সংকটের কারণে কোথাও গণরুম, কোথাও অতিরিক্ত কক্ষে শিক্ষার্থীদের থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাত্রীদের জন্য দুটি হল নির্মাণের কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হচ্ছে। তবে পুরোনো হলগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা ও নিরাপত্তার বিষয়টি সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

বেগম রোকেয়া হলের অনাবাসিক শিক্ষার্থী নন্দিনী আহসান পরিবারের সঙ্গে কেরানীগঞ্জ থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত এসে সেখান থেকে তাঁকে আরও প্রায় ৪০ মিনিট যেতে হয়। প্রতিদিন যাতায়াতেই চলে যায় দীর্ঘ সময়। খরচের পাশাপাশি ক্লান্তি ও শারীরিক ভোগান্তিও আছে। সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানোও সব সময় সম্ভব হয় না।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের বড় অংশ যদি প্রতিদিনের যাতায়াতেই চলে যায়, তাহলে লাইব্রেরি, গবেষণা, সহশিক্ষা কার্যক্রম কিংবা শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে একাডেমিক যোগাযোগের সুযোগ সীমিত হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ঠাঁই ১৯ শতাংশের
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি আরও প্রকট। প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৯ শতাংশ আবাসিক সুবিধা পান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ আবাসিক হলের ১০টি ছাত্র এবং পাঁচটি ছাত্রীদের জন্য। পুরোনো হলের অনেকটির আসন সংখ্যা সীমিত। ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাস-সংলগ্ন কটেজ, মেস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। আবাসনের চাহিদা ঘিরে ভাড়া বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। বাইরে থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের শুধু ভাড়াই নয়; খাবার ও যাতায়াতে বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান যশোর থেকে চট্টগ্রামে পড়তে এসেছেন। তাঁর ভাষায়, বাইরে থাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো থাকার পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থা করা। ভাড়া বেশি, বাইরে খাওয়ার খরচও বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে এ ব্যয় সামলানো কঠিন।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়েও পুরোনো সংকট
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসন সংকট আরও বেশি। রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৯২ শিক্ষার্থীর বিপরীতে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ১৮০ জনের। অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসনের বাইরে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দীপ্ত বড়ুয়া এখনও হলে আসন পাননি। শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের একটি মেসে থাকেন। মাসে শুধু মেস ভাড়া দেন ৩ হাজার টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে খাবার ও যাতায়াত খরচ।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও আবাসন অবকাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। একাডেমিক, প্রশাসনিক ও আবাসিক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হলেও বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমেনি।

হল দূরের কথা, নিজস্ব ক্যাম্পাসই নেই
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আবাসিক হল দূরের কথা; দেশের ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো ক্যাম্পাসই নেই! এগুলো চলে ভাড়া করা ভবনে। নিজেদের স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ছয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়– জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় তিনটি– খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় চারটি– চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
এ ছাড়া বিশেষায়িত ও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো– নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয়, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়।

কোথাও আবার প্রায় সবাই হলে
দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এক নয়। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পান। কৃষি ও কৃষিশিক্ষাভিত্তিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়েও আবাসন সুবিধা তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আবাসন সুবিধা বিস্তৃত। 

হল না বাড়িয়ে শিক্ষার্থী বাড়ানো
জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফায়েজ বলেন, নানা বাস্তবতা ও আর্থিক সক্ষমতার কারণে নতুন হল না করেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ ও আসন বাড়ানো হয়েছে। আবাসিক সুবিধা না বাড়িয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো উচিত নয়। তাঁর মতে, আবাসিক হলের আসন সংকট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন সমস্যার অন্যতম কারণ।

সংকটের প্রভাব শ্রেণিকক্ষেও
আবাসন সংকটের প্রভাব শুধু থাকার জায়গা পর্যন্ত সীমিত নয়। ১৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০০ শিক্ষার্থীর তথ্য নিয়ে হিট প্রকল্প পরিচালিত এক গবেষণায় আবাসনের ধরন ও পরিবেশের সঙ্গে ঘুম, ক্লাসে উপস্থিতি, ইন্টারনেট সুবিধা ও একাডেমিক সম্পৃক্ততার সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে আবাসন পরিবেশের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে কম ঘুম, ক্লাসে কম উপস্থিতি এবং দুর্বল ইন্টারনেট সুবিধার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। 

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় অংশের শিক্ষার্থী দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসে। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে ভালোভাবে পড়াশোনাও সম্ভব হয় না। আবাসন সম্প্রসারণের পাশাপাশি মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে হলের সিট বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি।

 

আরও পড়ুন

×