শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষ শ্রদ্ধা, সিরাজগঞ্জে দাফন
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৪৮
শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার আখতার হুসেনকে শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। সকাল ১০টার দিকে তার মরদেহ সেখানে নেওয়া হলে সহকর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, বিভিন্ন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা তাকে শেষবারের মতো ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। পরে ছাত্র ইউনিয়নের সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আখতার হুসেনকে স্মরণ করা হয়। শেষে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হয় গার্ড অব অনার।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আখতার হুসেনের মরদেহ সিরাজগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় সংসদ, দৈনিক প্রথম আলো, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) সহ আরও অনেক সংগঠন থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
আখতার হুসেনের ছোট ছেলে প্রমিত হুসেন বলেন, নিজের সমসাময়িক সহকর্মীদের মৃত্যু তাকে ভীষণভাবে শোকগ্রস্ত করে তুলেছিলো। তিনি চিকিৎসকের কাছে যেতে চাইতেন না শারীরিক জটিলতা থাকা স্বত্বেও। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। লাইফ সাপোর্টে রেখেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আখতার হুসেন। সেদিন বাদ মাগরিব তেজগাঁওয়ের রেলওয়ে জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার পক্ষে লেখনী নিয়ে সক্রিয় ছিলেন আখতার হুসেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার লেখা ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা/ আজ রুখবে তাদের কারা’ গানটি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অন্যতম স্মরণীয় সংগীত। অজিত রায়ের সুরে গানটি গেয়েছিলেন তিমির নন্দী। স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে গানটির সম্পর্ক আজও অম্লান।
১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর জন্ম নেওয়া আখতার হুসেনের পৈতৃক বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামে।
ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন আখতার হুসেন। ছড়া ও শিশুতোষ সাহিত্য ছাড়াও জীবনী, অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজে তার অবদান রয়েছে। সব মিলিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির পাঁচ খণ্ডের ‘শিশু-বিশ্বকোষ’-এ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভুক্তি লেখার কৃতিত্বও তার।
তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘উল্টোপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’, ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘কর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’, ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’ ও ‘চারণকবি মুকুন্দদাস’।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন আখতার হুসেন। এর মধ্যে রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক-শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার স্মৃতিপদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ প্রদত্ত মুক্তিযোদ্ধা কলম সৈনিক সম্মাননা স্মারক, মনিরউদ্দীন ইউসুফ সাহিত্য পুরস্কার, এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদক।
বাংলা একাডেমির ফেলো আখতার হুসেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। উদীচীর শুরুর দিকের বিভিন্ন নাটক রচনা ও নির্দেশনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি খেলাঘরের সংগঠক হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
খেলাঘরের জনপ্রিয় সংগীত ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’ তাঁর লেখা। ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠন সংগীত ‘আমরা তো ঐক্যের দৃঢ়বলে বলীয়ান, শোষণের কারাগার ভাঙবই’-এর রচয়িতাও তিনি। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিশু-কিশোরদের আন্দোলনে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন আখতার হুসেন।
- বিষয় :
- সিরাজগঞ্জ
- শহীদ মিনার
- দাফন