ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে: পরিবেশমন্ত্রী

মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থানে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হবে: পরিবেশমন্ত্রী
×

আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে আলোচনা সভায় অতিথিরা। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৪১ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৪৫

হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর রক্ষা, মানব–হাতি সংঘাত কমানো এবং বন্দী হাতির কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, সংরক্ষণ সংস্থা ও স্থানীয় জনগণকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বলেন, হাতি সংরক্ষণ শুধু একটি প্রাণীর সংখ্যা রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর, পরিবেশের ভারসাম্য এবং হাতির সঙ্গে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকার বিষয়ও জড়িত।

আজ শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনের শৈলপ্রপাত মিলনায়তনে ‘হাতি সংরক্ষণ: বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), আইইউসিএন বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স, অরণ্যক এবং দীপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বন্য হাতি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও প্রতিবেশব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বর্তমানে তাদের অস্তিত্ব গুরুতর সংকটের মুখে। দেশের শেরপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বন্য হাতির চলাচল বেশি।

২০১৬ সালে দেশে আনুমানিক ২৬৮টি হাতি ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে।

আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সংকুচিত হওয়া, বন উজাড়, খাদ্যের সংকট, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদের মতো বিভিন্ন কারণে মানব–হাতি সংঘাত বাড়ছে বলে জানান মন্ত্রী। বলেন, হাতি লোকালয় বা কৃষিজমিতে ঢুকে পড়লে মানুষ ও হাতি উভয়ই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এ কারণে সংঘাতের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর রক্ষা, সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা জোরদার করা হবে বলে জানান তিনি। সংরক্ষণ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগণকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী।

মন্ত্রী বলেন, এশীয় হাতির চলাচলের জন্য বিস্তৃত এলাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ফলে এখানে হাতি সংরক্ষণ একটি জটিল কাজ। এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

এ জন্য বন অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কর্তৃপক্ষ, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় হাতি শিকার ও পাচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, এসব এলাকায় নজরদারি বাড়াতে বন অধিদপ্তর ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে।

সীমান্ত সড়কসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনার পর্যায়েই হাতির ঐতিহ্যগত চলাচলের পথ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে হাতিসহ অন্যান্য বৃহৎ বন্য প্রাণীর নিরাপদ চলাচল ও পারাপারের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।

বন্দী হাতির কল্যাণের বিষয়ে পরিবেশমন্ত্রী বলেন, বন্দী হাতির লাইসেন্স, সংখ্যা ও অবস্থার যথাযথ রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। এগুলোর নিয়মিত পর্যবেক্ষণও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রশিক্ষণের নামে হাতিকে শিকলে রাখা, প্রহার ও নির্যাতনের অভিযোগ এবং সার্কাসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে হাতি ব্যবহারের বিষয়গুলো যথাযথ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা হাতির জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডোর সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে মানব–হাতি সংঘাত কমানো এবং বন্দী হাতির সংখ্যা, অবস্থান, লাইসেন্স ও কল্যাণের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংরক্ষণ সংস্থা, গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগও জোরদার করা হবে।

বেলার প্রধান নির্বাহী ও সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী, পক্ষীবিদ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আলী রেজা খান এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) শামিমা বেগম।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, হাতি সংরক্ষণে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে তারা প্রস্তুত। ইকোট্যুরিজম, বন্দী হাতিকে মুক্ত করা বা পুনরায় বনে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে স্পষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা প্রয়োজন।

তিনি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য একটি ‘ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাব দেন। হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা এবং প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ক্ষেত্রে কার্যকর নীতিমালা ও শাস্তির বিধান নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। বন্দী হাতির জন্য মধ্যমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন রিজওয়ানা হাসান।

ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ল্যান্ড জোনিং ম্যাপ তৈরি করে তার ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং খাস জমি বন বিভাগের বাইরে অন্য কোনো কাজে বরাদ্দ না দিয়ে বনায়নের আওতায় আনার প্রস্তাব দেন অংশীজনরা। হাতির খাদ্যসংকট মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও প্রণোদনা ব্যবস্থার কথাও বলা হয়।

আরও পড়ুন

×