ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রমজানে খেজুরের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা

জাহাজ ভাড়া বেড়েছে প্রায় চার গুণ

রমজানে খেজুরের সরবরাহ নিয়ে শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা
×

 জসিম উদ্দিন বাদল 

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে জাহাজ চলাচলে জটিলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানিতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে চার গুণ বেশি সময় লাগছে। একই সঙ্গে উচ্চ শুল্কের পাশাপাশি কনটেইনার ভাড়াও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে দেশে পর্যাপ্ত খেজুরের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দর স্বাভাবিক রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছেন ফল ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় খেজুরকে ‘নিত্যপণ্য’ বিবেচনা শুল্ক-কর কমানো, শুল্কায়ন মূল্য সংশোধন এবং অন্যান্য সমস্যার দ্রুত সমাধান হলে রমজানে বাজারে খেজুর সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে। 

সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এক চিঠিতে এমন উদ্বেগ জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই। ফল আমদানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফআইএ) পক্ষ থেকে পাঠানো আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এফবিসিসিআই এ উদ্যোগ নিয়েছে। 

এনবিআরকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সংকটের কারণে খেজুরের আমদানি ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে এবং আমদানিকারকদের পণ্য পৌঁছাতে আগের চেয়ে বেশি সময় লাগছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে খেজুরের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে শুল্ক ও অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু বা শুল্কায়ন মূল্য পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রতিবছরই রমজান মাস উপলক্ষে খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও শুল্ক ছাড় দেওয়া জরুরি।
বিএফএফআইএর তথ্যমতে, দেশে রমজান মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন খেজুরের চাহিদা থাকে। আমদানি করা খেজুরের বড় অংশ আসে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মিসর ও ইরাক থেকে, যা সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

ফল আমদানিকারকরা জানান, ইরান-আমেরিকা সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জাহাজ চলাচলে সৃষ্ট সংকটে ওমান, জেদ্দা ও খোরফাক্কান-শারজাহর মতো সীমিত কিছু বন্দর সচল থাকলেও সেখান থেকে নিয়মিত কনটেইনার জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া আগে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পৌঁছাতে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগলেও এখন তা বেড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ভাড়া প্রায় দুই হাজার ডলার থেকে বেড়ে সাত থেকে আট হাজার ডলারে ঠেকেছে, যা আগের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি। পণ্য পৌঁছাতে ঠিক কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে জাহাজ কোম্পানিগুলোও সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। 

সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে খেজুরের মৌসুম শুরু হয় সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে। বিএফএফআইএর দাবি, এখনই যদি শুল্ক ছাড় ও আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক ‘অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু’ নির্ধারণ না করা হয়, তাহলে ব্যবসায়ীরা আমদানি থেকে পিছিয়ে আসবেন। ফলে রমজানে বাজারে খেজুরের সংকট তৈরি হতে পারে এবং দাম সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সময়মতো ছাড় দেওয়া হলে আমদানিকারকরা পর্যাপ্ত পরিমাণে খেজুর আমদানিতে উৎসাহিত হবেন এবং রমজানে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক ও বাজার স্থিতিশীল থাকবে। 
শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে এনবিআরের এক কর্মকর্তা বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে খেজুর আমদানিতে শুল্ক-কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। এবার এখনও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সরকারের সবুজ সংকেত পেলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাজারে দর কেমন
রমজান মাসে নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চ– সব মানের খেজুর বেচাকেনা হয়। তবে এখন খুচরা বাজারে মধ্যম ও উচ্চ মানের খেজুর বেশি বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি আজওয়া খেজুর মানভেদে ৮০০ থেকে ১০০০, মেডজুল ১৫০০ থেকে ১৮০০, মরিয়ম ৬০০ থেকে ১০০০, আম্বার ৮০০ থেকে ১০০০ ও খাসাব খেজুর ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সরকারি সংস্থা টিসিবির তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে খেজুরের দাম বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। 

অযৌক্তিক শুল্কায়ন
আমদানিকারকরা জানান, খেজুরে বর্তমানে ৫৮ শতাংশের বেশি শুল্ক রয়েছে। কিন্তু শুল্কায়ন মূল্য অনেক বেশি রাখা হচ্ছে। যেমন, ৯০০ ডলারে আমদানি করা খেজুরে শুল্কায়ন মূল্য ধরা হয় দুই হাজার ডলার। 
ফল আমদানিকারক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মধ্যবিত্তের জন্য আলজেরিয়া বা তিউনিসিয়া থেকে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ ডলারে আনা খেজুরের ওপর শুল্ক দিতে হয় প্রায় দুই হাজার ২০০ ডলার, ফলে কার্যকর শুল্ক হার দাঁড়ায় প্রায় ১১২ শতাংশ। এতে আগে যে কনটেইনারে তিন লাখ টাকা শুল্ক ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ভারতে প্রতি কেজি খেজুরে শুল্ক মাত্র ছয় টাকা, কিন্তু বাংলাদেশে ১৫০ টাকা। রোজার আগেই শুল্ক ও শুল্কায়ন মূল্য কমানো না হলে আমদানিকারকরা বড় লোকসানে পড়বেন।

ভোক্তা অধিদপ্তরে সভা
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার অধিদপ্তরে দেশের ফল আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়েছে। ওই সভায় আমদানিকারকরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে খেজুরের চালানে জটিলতা তৈরি হতে পারে। নভেম্বর থেকে কম শুল্কে এলসি খোলার অনুমতি না পেলে রমজানে খেজুরসহ বিভিন্ন ফলের সরবরাহে সংকট দেখা দিতে পারে। তারা অধিদপ্তরকে জানিয়েছেন, ফলের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ আমদানি শুল্ক। রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে হলে শুল্ক কমানোর বিকল্প নেই। ফলের চাহিদা পূরণে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। বিশেষ করে ইরাক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি করা হয়। হরমুজ প্রণালির বর্তমান সংকটের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, আমদানি শুল্কের বিষয়টি নীতিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের নেতিবাচক প্রভাব যাতে দেশের বাজারে না পড়ে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা যেন স্বাভাবিক থাকে, সেদিকে তারা নজর রাখছেন। 
 

আরও পড়ুন

×