ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ব নদী দিবস আজ

দূষণের ৪২৪ উৎসমুখের ১৬৬টি বুড়িগঙ্গা নদীতে

হাইকোর্টের নির্দেশের পরও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে তীরে

দূষণের ৪২৪ উৎসমুখের ১৬৬টি বুড়িগঙ্গা নদীতে
×

বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে থাকা বর্জ্য ১৫ দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তিন সপ্তাহ আগে পেরিয়ে গেছে সেই সময়সীমা। গতকাল শনিবার কামরাঙ্গীরচর থেকে তোলা -সাজ্জাদ নয়ন

 জাহিদুর রহমান  

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর লালবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের ইসলামবাগ এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতীরে থাকা প্লাস্টিকসহ সব ধরনের বর্জ্য ১৫ দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। গত ২ সেপ্টেম্বর দেওয়া সেই নির্দেশনার সময় পার হলেও বর্জ্য অপসারণের কাজ শুরু হয়নি। নদীতীরে আগের মতো পড়ে আছে প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, প্যাকেটসহ নানা বর্জ্য। কোথাও কোথাও এসব বর্জ্য স্তূপ হয়ে আছে। আবার নদীর পানিতেও ভাসছে প্লাস্টিক ও আবর্জনা।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্য দেশের মতো আজ রোববার বাংলাদেশেও পালন করা হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

গত শুক্রবার ইসলামবাগ এলাকায় বুড়িগঙ্গা তীরে গিয়ে দেখা যায়, নদীপারের বিভিন্ন অংশে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট, কাপড়, কাগজ ও অন্যান্য বর্জ্য পড়ে আছে। কিছু জায়গায় নদীর পানির কিনারে এসব বর্জ্যের স্তূপ। জোয়ার-ভাটা ও নৌযানের চলাচলে বর্জ্যের একটি অংশ পানিতে মিশে যাচ্ছে। নদীর পানির ওপরেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় প্লাস্টিক ও পলিথিন। 
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নদীতীরের এই অংশে বর্জ্য জমছে। নিয়মিতভাবে বর্জ্য অপসারণ না হওয়ায় এক পর্যায়ে নদীর পারই ময়লা ফেলার জায়গায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকেও বর্জ্য নদীর তীরে ফেলা হয় বলে তাদের অভিযোগ।

ইসলামবাগের বাসিন্দা মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘নদীতে তো দূষণ হইতেই আছে। সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে, নদী কীভাবে দূষণমুক্ত করা যায়– আমরা সেটাই চাই। কিন্তু বর্জ্য পড়ে থাকলে নদী কীভাবে পরিষ্কার হবে?’

বুড়িগঙ্গায় নৌকা চালান আব্দুর রব। নদীতীরের বর্জ্য দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো পরিষ্কার চাই। নদী পরিষ্কার থাকলে আমাদেরই ভালো। এই পানি দিয়ে চলতে পারি, হাত-পা ধুতে পারি। ময়লা থাকলে তো এসব করা যায় না।’

আদালতের নির্দেশেও বদলায়নি চিত্র
বুড়িগঙ্গা দূষণ নিয়ে আদালতের নির্দেশ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১০ ও ২০১১ সালেও নদীটির দূষণ বন্ধে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এরপরও বছরের পর বছর নদীটির দূষণ বন্ধ হয়নি। বরং রাজধানীর জনসংখ্যা, শিল্পকারখানা ও বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর ওপর চাপও বেড়েছে। এবার ২ সেপ্টেম্বর দেওয়া নির্দেশে বুড়িগঙ্গার তীরের প্লাস্টিকসহ সব ধরনের বর্জ্য অপসারণের জন্য ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। সেই সময় পার হলেও বর্জ্য অপসারণের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।

পরিবেশ ও নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে শুধু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে চিঠি চালাচালি হলে হবে না। মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব 
নির্ধারণ করে নিয়মিত তদারক করতে হবে। একই সঙ্গে নদীতীরে নতুন করে বর্জ্য ফেলার পথও বন্ধ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। শুধু নদী থেকে বর্জ্য তুলে ফেললে হবে না, বর্জ্য নদীতে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। দেশের নদীগুলোতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বুড়িগঙ্গায় যাচ্ছে। তাই নদী পরিষ্কারের পাশাপাশি টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।

৪২৪ দূষণ উৎসমুখ
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সম্প্রতি এক জরিপে ঢাকার আশপাশের নদনদীতে বর্জ্য নিঃসরণের ৪২৪টি উৎসমুখ শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় চিহ্নিত হয়েছে ১৬৬টি এবং তুরাগে ৫৮টি । জরিপে ঢাকা ওয়াসার ৬৬টি উৎসমুখও শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উৎস এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বেসরকারি শিল্পকারখানার বর্জ্য নিঃসরণের পথ চিহ্নিত হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির বলেন, নদীর দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে চিঠি দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জবাবও পাওয়া গেছে। অবৈধ দখল ও দূষণ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হচ্ছে।
বুড়িগঙ্গার দূষণের বড় একটি উৎস সরাসরি পয়োনিষ্কাশন। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় কামরাঙ্গীরচরের শেখ রাসেল স্কুল থেকে ফরাশগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় নদীতে সরাসরি অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য ফেলার ২৫১টি পাইপলাইন চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গার বাম তীরে, অর্থাৎ পুরান ঢাকার দিকে ১৩৭টি এবং ডান তীরে, অর্থাৎ কেরানীগঞ্জের দিকে ১১৪টি পয়োনিষ্কাশন সংযোগ রয়েছে।

আরডিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বলেন, মাঠ পর্যায়ে তদন্তের মাধ্যমে এসব পয়োনিষ্কাশন সংযোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো পাগলা পয়োশোধনাগারে স্থানান্তর করা গেলে নদীতে সরাসরি অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য পড়া বন্ধ করা সম্ভব। ২৫১টি সংযোগ বন্ধ করা গেলে বুড়িগঙ্গার দূষণের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ জন্য ছোট পরিসরে প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।
আরডিআরসির ওই গবেষণায় বুড়িগঙ্গার তীরজুড়ে ২৫৭টি বর্জ্য ফেলার পয়েন্টও চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ডান তীরে ১৪৮টি এবং বাম তীরে ১০৯টি। এ ছাড়া শিল্পকারখানা থেকে অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার ৯৩টি পয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে।

মাছ বেঁচে থাকার মতো অক্সিজেন নেই
বুড়িগঙ্গার দূষণের প্রভাব নদীর জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের ওপরেও পড়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, বুড়িগঙ্গার পানিতে প্রচুর মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা মাছ বেঁচে থাকার উপযোগী নয়। জৈব অক্সিজেন চাহিদা ও রাসায়নিক অক্সিজেন চাহিদার অবস্থাও উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গার পানিতে ক্যাডমিয়াম ও পারদের মতো ভারী ধাতুও পাওয়া গেছে। ফলে দেশীয় মাছের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। দূষিত পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন বিদেশি সাকার মাছের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ‘বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন রূপরেখা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। সুস্থ জলজ পরিবেশের জন্য প্রতি লিটার পানিতে অন্তত পাঁচ মিলিগ্রাম দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রয়োজন হলেও বুড়িগঙ্গায় তা গড়ে ১ দশমিক ৭ থেকে ২ দশমিক ৬৮ মিলিগ্রামে নেমে এসেছে। শুষ্ক মৌসুমে কোনো কোনো এলাকায় তা শূন্যের কাছাকাছি বা এক মিলিগ্রামের নিচেও নেমে যায়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, নদীতে যে দূষিত পানি আসছে, এর উৎস চিহ্নিত করে বন্ধ করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে দূষণ কমানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না।
পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন শিল্প সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ইটিপি নেই কিংবা ইটিপি থাকলেও কার্যকর নয়, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে। এরপর জরিমানা ও প্রয়োজনে কারখানা বন্ধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×