প্রাণি জগৎ
বিরল বড় কালো ঈগল
ভুটানের পারো শহরে হিমালয়ের পাদদেশে বেসক্যাম্প হোটেলের সামনে উড়ন্ত বড় কালো ঈগল- লেখক
আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২১ | ১২:০০
পারো জং (দুর্গ) থেকে বিচিত্র লাল চঞ্চুর কালো কাফের (কাক গোত্রের পাখি) ছবি তুলে ইয়াংকি রিসোর্টের উদ্দেশে গাড়িতে উঠলাম। কিন্তু গাইড কাম ড্রাইভার কর্মা জানাল আমাদের হোটেল বদলে গেছে। নতুন ঠিকানা 'বেসক্যাম্প হোটেল'। 'এটা কি হিমালয়ের কাছে কোথাও'?- জিজ্ঞেস করতেই কর্মা বলল- 'হিমালয়ান রেঞ্জের পাদদেশে, ড্রুগিয়েল জং-এর পাশে'। মুহূর্তেই চোখের সামনে হিমালয়ের ছবি ভেসে উঠল! বেসক্যাম্প হোটেলে ঢুকে গাড়ি থেকে নেমেই দেখলাম দৈত্যের মতো হিমালয়ের নাম না জানা এক শৃঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সামনে! ওর দিকে তাকিয়ে বুক ভরে দম নিলাম। পাশেই চমৎকার এক আপেল বাগান। এমন দৃশ্য জীবনে খুব কম দেখেছি। প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। কাজেই নিজ রুম বুঝে নেওয়ার জন্য হোটেলের রিসেপশন ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেলাম।
দ্রুত লাঞ্চ সেরে আপেল বাগানে এলাম। চমৎকার রোদেলা দুপুর। মিষ্টি এক ফালি রোদ মুখে আছড়ে পড়ল। শীত শীত রোদের ছটা মন্দ লাগল না। পাহাড়ের ওপর থেকে হঠাৎই একটি কালো পাখিকে উড়ে আসতে দেখলাম। ওড়ার ঢংই ওর পরিচয় বলে দিল। এ যে মেঘ না চাইতেই জল! নিজ দেশে যাকে কখনও দেখতে পাবো বলে ভাবিনি, সে এখন আমার মাথার ওপরে। ওর দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম। হতবিহ্বল হয়ে ক্যামেরায় ক্লিক করতেই ভুলে গেলাম। সম্বিৎ ফিরতেই ক্যামেরা তাক করলাম। মাত্র তিনটা ক্লিক করতে পারলাম। পাখিটা অলস ভঙ্গিতে উড়তে উড়তে পাশের বড় গাছটার আড়ালে হারিয়ে গেল, আর খুঁজে পেলাম না।
ভুটানের পারো শহরের বেইসক্যাম্প হোটেলে দেখা পাখিটি বড় কালো ঈগল। ইংরেজি নাম Black Eagle। এটি এ দেশের বিরল আবাসিক পাখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বান্দরবানের গহীন অরণ্যে বেশ ক'বার দেখা গেছে। তবে, ওখানে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়নি। পাখিটি সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত খুব বেশি পাওয়া যায়নি। Accipitridae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Ictinaetus malaiensis. বাংলাদেশ এবং ভুটান ছাড়াও ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনেক বড় কালো ঈগল দেখা যায়।
কালো ঈগল বড় আকার ও ছিপছিপে দেহের শিকারি পাখি। চঞ্চুর আগা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৬৫-৮১ সেন্টিমিটার। প্রসারিত অবস্থায় এক ডানার প্রান্ত থেকে অন্য ডানার প্রান্ত পর্যন্ত মোট দৈর্ঘ্য ১৪৮-১৮২ সেন্টিমিটার। তবে, আকারে বড় হলেও তুলনামূলকভাবে ওজন কম, মাত্র ১.০-১.৬ কেজি। একনজরে ঈগলটির পুরো দেহ কালো। ডানা লম্বা। চঞ্চু ফ্যাকাশে গোলাপি, যার আগা কালো ও গোড়া হলদে। পা ও আঙুল হলুদ। লেজে হালকা ডোরা। লেজের ওপরের পালক-ঢাকনি ফ্যাকাশে। ওড়ার সময় ডানার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ 'ভি'-আকার নজরে আসে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির রঙে-ঢঙে কোনো পার্থক্য নেই। তবে, অন্যান্য ঈগল-বাজ-চিলের মতো আকারে স্ত্রীপাখি খানিকটা বড়। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা, দেহতল ও ডানার নিচের অংশ হালকা হলুদ।
এরা বান্দরবানের চওড়া পাতার মিশ্র চিরসবুজ বনের গহীনে বাস করে। দিবাচর পাখিগুলো বড় আকারের ডানা মেলে বেশ নিচু দিয়ে ধীর গতিতে ওড়াওড়ি করে। বাদুর, কাঠবিড়ালি, অন্যান্য ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি ও পাখির ডিম খেতে পছন্দ করে। সচরাচর 'কিউক-কিউক-কিউক-' স্বরে ডাকে।
জানুয়ারি থেকে এপ্রিল প্রজনন মৌসুম। এ সময় আবাস এলাকার কোনো উঁচু গাছের ডাল বা পাহাড়ের চূড়ায় ডালপালা দিয়ে প্রায় এক মিটার ব্যাসবিশিষ্ট মাচার মতো বাসা বানায়। সবুজ পাতা দিয়ে বাসার গদি তৈরি করে। একই বাসা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। স্ত্রী বাদামি দাগছোপসহ ১-২টি সাদা রঙের ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ৪৪-৪৫ দিনে। ছানারা প্রায় ৯৭ দিন বয়সে উড়তে শিখে। আয়ুস্কাল ১৭-১৮ বছর।
লেখক: অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।
- বিষয় :
- প্রাণি জগৎ
- কালো ঈগল
- বড় কালো ঈগল